বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস আজ

699

ক্যান্সার প্রতিরোধে অধ্যাপক ড. মো. আবু সাঈদ’র পরামর্শ
মেহেরাব্বিন সানভী: আজ বিশ্ব শিশু ক্যান্সার দিবস। প্রতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিবসটি পালন করে। ক্যান্সার রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং এই রোগ প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করাই মূলত দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য। শিশু ক্যান্সার নিয়ে দৈনিক সময়ের সমীকরণের সাথে পরামর্শমূলক কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত মেডিসিন গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা মেডিকেল কলেজের দায়িত্বরত পরীক্ষক অধ্যাপক ড. মো. আবু সাঈদ।
ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যান্সারের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর ২ লাখ শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। আর এর মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেই আক্রান্ত হয় শতকরা ৮০ ভাগ। এখানে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের বেঁচে থাকার হার মাত্র ৫ ভাগ যেখানে উন্নত দেশগুলোয় এই হার শতকরা ৮০ ভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতি বছর ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার শিশু-কিশোর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু অনকোলজি বিভাগে ২০১০ সালে ২৮০, ২০১১ সালে ৪০০ এবং ২০১২ সালে ৪৫৫টি শিশুকে ক্যান্সার আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, সঠিক ডায়গনস্টিক হলে এ সংখ্যাটি আরো বাড়বে। আর মৃত্যুর হারও আশঙ্কাজনক। কেবল ২০০৫ সালেই ক্যানসারে মৃত্যুর হার ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এখনই সচেতন না হলে ২০৩০ সাল নাগাদ মৃত্যুর হার দাঁড়াবে ১৩ শতাংশে। দুঃখজনক হলো বাংলাদেশে শিশুদের ক্যান্সারের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তথাপি এ সংখ্যাটি বাড়ছে।
বাংলাদেশের বিখ্যাত মেডিসিন গবেষক, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা মেডিকেল কলেজের পরীক্ষকের দায়িত্বপালনসহ দেশের মেডিকেল সায়েন্সের অধ্যাপক ও কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ জাতীয় পর্যায়ের সমাজর্কমী অধ্যাপক ড. মো. আবু সাঈদ দৈনিক সময়ের সমীকরণ’র এই প্রতিবেদকের সাথে শিশু ক্যান্সারের কারণসহ এর রোগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করেন। শিশু ক্যান্সারের কারণ কি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জিনগত, খাবারে বিষ জাতীয় পদার্থের উপস্থিতি, বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থসহ পরিবেশগত সমস্যায় শিশুদের ক্যান্সার হয়। তবে প্রাথমিকভাবে এ রোগ শনাক্ত করা গেলে বেশিরভাগ শিশুরই ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে শিশু ক্যানসারের প্রভাব কেমন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। শিশুদের ব্লাড ক্যান্সার বেশি হলেও নসিকাগ্রন্থী, কিডনি ও চোখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া শিশুর সংখ্যাও কম নয়। শিশুদের ক্যানসার প্রতিরোধে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোন ধরনের ক্যান্সারটা বেশি সেটার একটা ডাটা থাকা দরকার, তবে বাংলাদেশে এক্ষেত্রে সঠিক কোনো তথ্য নেই। নেপালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে সরকারিভাবে তাদেরকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা হয়। ফলে দেখা যাচ্ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে তারা সাহায্যের আবেদন করছে। সুতরাং জানা যাচ্ছে কোথায় কি কারণে কতজন শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে প্রতিরোধে ব্যাবস্থা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বর্তমানে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা প্রকার সাহায্য সহযোগিতা করছে। তাছাড়া তাদের সঠিক ডাটা সংগ্রহেও কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে এটা নিয়ে আন্দোলনও হচ্ছে। সুতরাং মনে হয়, অচিরেই আমরা এটা প্রতিরোধে আরো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবো। শিশুদের ক্যানসার প্রতিরোধে কোন ধরনের খাবার খাওয়া এবং না খাওয়া ভালো? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। শিশুদের মধ্যে কোলন ও লিভার ক্যান্সার বেশি হয়। এর অন্যতম কারণ তারা শাক-সবজি খুব কম খায়। ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় বেশি খায়। ক্যান্সার প্রতিরোধে শিশুদের সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন পালং শাক, ডিমের কুসুম, মটরশুটি, কলিজা, মুরগীর মাংস, কচুশাক, কলা, মিষ্টি আলু, কমলা, শালগম, দুধ, বাঁধাকপি, বরবটি, কাঠবাদামের মতো ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম এবং আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। সর্বশেষ তিনি বলেন, ক্যান্সার শিশুদের জন্য একটি নীরব ঘাতক হিসাবে চিহ্নিত। ক্যান্সারে আক্রান্ত যত শিশু রয়েছে তার ৯০ভাগই দরিদ্র। ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে মাত্র ১জন উন্নত চিকিৎসা পায়। ক্যান্সার চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। কিন্তু ক্যান্সার প্রতিরোধ করাই কার্যকর এবং সাশ্রয়ী সমাধান। তাই আমাদের ক্যান্সার প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে প্রত্যেককেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অর্থাৎ অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং চর্বি বিশেষ করে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, কোমল পানীয় পান, অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম, দূষণজনিত সমস্যা, ও অত্যধিক মদ্যপান অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে ক্যান্সোরের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।