বিনা টেন্ডারে সরকারি গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ

170

প্রতিবেদক, আন্দুলবাড়ীয়া:
চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নিশ্চিন্তপুর- পুরন্দপুর গ্রামীণ সড়কে সামাজিক বনায়নের গাছ সরকারি অনুমোদন-টেন্ডার ছাড়াই কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সামাজিক বনায়ন সমিতির সভাপতি আমিনুর রহমান আমিনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগের পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় উপকারভোগীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় ২০০৯-১০ অর্থবছরে উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর থেকে পুরন্দপুর পর্যন্ত সড়কের দুই ধারে সামাজিক বনায়ন সমিতির তত্ত্বাবধানে বাগান সৃজন করা হয়। বিভিন্ন ফলদ-বনজ গাছ ছাড়াও সেখানে দেশীয় বাবলা, নিম, রেন্টি-কড়ইগাছ গাছ লাগানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমিতির সদস্যরা উপকারভোগী হিসেবে এ গাছগুলোর দেখভাল করে আসছেন। সম্প্রতি ওই রাস্তা পাকাকরণের অজুহাতে রাস্তার দুই ধারে বেড়ে ওঠা সমিতির গাছগুলো কোনো প্রকার টেন্ডার ছাড়াই কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মানুযায়ী, সামাজিক বনায়নের গাছ কর্তনের আগে গাছ জরিপ হয় এবং তা বিশেষ চিহ্ন দ্বারা মার্ক করে টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করা হয়। গাছ বিক্রির টাকা চুক্তি অনুযায়ী সমিতির উপকারভোগী সদস্য, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, জমির মালিক ও বনবিভাগ কর্তৃপক্ষের মধ্যমে বন্টন করা হয়। কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে রাস্তা পাকাকরণ ও প্রস্তুতকরণের অজুহাতে বিনা টেন্ডারে গাছ কর্তন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অবৈধভাবে সমিতির গাছ কর্তনের ব্যাপারে উপকারভোগীরা বাধা দিলেও তা আমলে নিচ্ছেন না জীবননগর উপজেলা বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ ও সমিতির সভাপতি স্থানীয় প্রভাবশালী আমিনুর রহমান আমিন।
এ বিষয়ে রাস্তার পাশের জমির মালিক উপকারভোগী নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মৃত ইব্রাহিম মণ্ডলের ছেলে রেজা আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, ‘কোনো টেন্ডার ছাড়াই গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমি প্রতিবাদ করলে তা অগ্রাহ্য করে ইতিমধ্যেই শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আমার জমি-সংলগ্ন ৫০-৬০টির মতো বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। সমিতির সভাপতি আমিনুর রহমান আমিন ও জীবননগর উপজেলা বন বিভাগের কর্মচারী মাহবুব ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে গাছ কর্তন করেছেন। আমি এ ঘটনার ব্যাপারে জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিরাজুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। ইউএনও স্যার এ বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করতে উপজেলা বন বিভাগ কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত বন বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রাস্তা প্রস্তুতকরণে গাছ কাটার কোনো প্রয়োজন নেই।’
এ অভিযোগের ভিত্তিতে সত্যতা জানতে গতকাল বুধবার সকাল ১১টায় সরেজমিনে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, নিশ্চিন্তপুর-পুরন্দপুর সড়কের দুই ধারের সামাজিক বনায়নের বেশকিছু মূল্যবান গাছ কাটা হয়েছে। আবার কিছু গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সামাজিক বনায়ন সমিতির সভাপতি আমিনুর রহমান আমিন বলেন, ‘উপজেলা বন বিভাগের সঙ্গে কথা বলে গাছ কাটা হচ্ছে। টেন্ডার দেওয়া-না দেওয়ার মালিক উপজেলা বনবিভাগ। রাস্তা প্রস্তুতকরণের স্বার্থে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভেকু মেশিন দিয়ে গাছ উপড়ে দেওয়ায় গাছগুলো বনবিভাগ কর্তৃপক্ষ কেটে নিচ্ছে, পরবর্তীতে তা টেন্ডার দেওয়া হবে। যেখানে গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার সময় বন বিভাগের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন, সেখানে আমার কী করার আছে?’
আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার শেখ মাফিজুর রহমান মাফি এ বিষয়ে দৈনিক সময়ের সমীকরণকে বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রাস্তার কাজ শুরু করেছে। তারা রাস্তার মাটি কাটতে গিয়ে ভেকু মেশিন দিয়ে গাছও উপড়ে ফেলেছে। তবে কৌশলে কাজ করলে গাছ না কেটেও রাস্তার মাটি কাটা সম্ভব ছিল। কাটা গাছগুলো এলাকায় রাখা আছে বলে জানান তিনি।
আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও আন্দুলবাড়ীয়া বাজার কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মহিদুল ইসলাম মধু জিহাদী বলেন, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রাস্তাটি পাকাকরণের কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। রাস্তা পাকাকরণের অজুহাতে রাস্তার দুই ধারের বেশ কিছু মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বলা হচ্ছে বনবিভাগ গাছগুলো কাটছে। যতটুকু জানতে পেরেছি, বনবিভাগ কোনো টেন্ডার ছাড়াই গাছগুলো কেটেছে। তবে এ ব্যাপারে ইউএনও সাহেবকে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার হয়নি। আমার জানা মতে, সামাজিক বনায়নের গাছ না কেটেও রাস্তা পাকাকরণ ও প্রস্তুতকরণ কাজ করা সম্ভব ছিল।
জীবননগর উপজেলা বন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কাজল বলেন, ‘রাস্তা প্রস্তুতকরণের কাজ চলছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে বেশকিছু গাছ ভেকু মেশিন দিয়ে উপড়ে দিয়েছে। আমরা সেই গাছগুলো সমিতির লোকজনকে কেটে রাখতে বলেছি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হবে।’
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নিশ্চিন্তপুর-পুরন্দপুর রাস্তায় সামাজিক বনায়নের গাছ কেটে নেওয়ার ব্যাপারে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়ায় তা উপজেলা বন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বরাবর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠিয়েছি।’