বিদায়ের সুর ও বিষাদের ছায়ায় ভক্তদের শ্রদ্ধা ভালবাসায় দেবী দুর্গার বিসর্জন

27

চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ সারা দেশে সংসারের সমৃদ্ধি কামনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সিঁদুর খেলা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী দুর্গাকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাম্বলীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। গতকাল মঙ্গলবার চোখের জলে ‘মা দুর্গাকে’ বিদায় জানানো হয়। চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ সারা দেশে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। ৪ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। বিজয়া দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তারা এ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন।
চুয়াডাঙ্গা:
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে শুক্রবার ষষ্ঠীতে শুরু হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। বোধনে অরুণ আলোর অঞ্জলি নিয়ে আনন্দময়ী মা উমাদেবীর (দেবী দুর্গা) আগমন ঘটে মর্ত্য।ে পরের তিন দিন আনন্দের বর্ণিল ছটা ছড়িয়ে যায় সর্বত্র। গতকাল মঙ্গলবার সেখানে বাজল বিষাদের করুণ সুর। হিন্দু বিশ্বাসে টানা পাঁচদিন মৃন্ময়ীরূপে ম-প ছেড়ে ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে স্বামী শিবের সান্নিধ্যে। বছর ঘুরে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখো ভক্তকে ভারাকান্ত করে ঘোড়ায় চড়ে বিদায় নিলেন দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। এরই মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিহিত পূজার পর ভক্তের কায়মনো প্রার্থনা আর ঢাক-উলুধ্বনি-শঙ্খনিনাদে হিন্দু রমণীদের পরম আকাক্সিক্ষত সিঁদুর খেলায় মুখর হয়ে ওঠে মন্দিরগুলো। একদিকে বিদায়ের সুর, অন্যদিকে উৎসবের আমেজ। বিকেল হতেই ম-পের পার্ট চুকিয়ে বিজয়া শোভাযাত্রা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন সবাই। সন্ধ্যায় চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গার তীরজুড়ে ‘দুর্গা মা কি, জয়। মহামায়া কি, জয়।’ একের পর এক এমন জয়ধ্বনি, ঢাক-ঢোল, কাঁসর ও ঘণ্টা বাজিয়ে প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। বড় বাজার দুর্গা মন্দির থেকে শোভাযাত্রা বের করে ফেরিঘাট রোডের রাহেলা স্কুল-সংলগ্ন ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় অনেক ভক্ত কান্নায় ভেঙে পড়েন। এর আগে সকাল ৯টা ৫৭ মিনিট থেকে দেবী বিসর্জনের লগ্ন শুরু হয়। ফলে সকাল থেকেই ম-পে ম-পে নামে ভক্তদের ঢল। এ সময় ম-পে ম-পে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, মন্ত্রপাঠ, উলুধ্বনি, অঞ্জলি, নাচ, সিঁদুর খেলা হয়। মুখরিত হয়ে ওঠে ম-প প্রাঙ্গণ। ধান, দুর্বা, মিষ্টি আর আবির দিয়ে দেবীকে বিদায় জানান ভক্তরা।
একদিকে বিদায়ের সুর, অন্যদিকে উৎসবের আমেজ। মালোপাড়া, দাসপাড়া, তালতলা, কুলচারা, আলুকদিয়া, দৌলাতদিয়াড় এলাকার পূজাম-পগুলো থেকেও শোভাযাত্রা বের করে মাথাভাঙ্গা নদীর বিভিন্ন অস্থায়ী ঘাটে সেগুলো বিসর্জন দেওয়া হয়। সকালে দেওয়া হয় দর্পণ ঘট বিসর্জন। এমনই আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গতিনাশিনী দেবী বাবার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে গেলেন স্বামীগৃহে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অসুর শক্তি বিনাশকারী দেবী বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে সব অপশক্তির বিনাশ হবে। শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে যাবে সবখানে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় মাথাভাঙ্গার দুই তীরে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী ভিড় জমান। অনেকে প্রতিমা বিসর্জনের সময় নৌকায় করে নদীতে আনন্দ-উৎসব করেন। আবার অনেকে মায়ের বিদায়ের বিরহে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
প্রথা অনুযায়ী, প্রতিমা বিসর্জনের পর সেখান থেকে শান্তির জল মঙ্গলঘটে নিয়ে তা হৃদয়ে ধারণ করা হয়। আগামী বছর আবার এ শান্তির জল হৃদয় থেকে ঘটে, ঘট থেকে প্রতিমার সম্মুখে রেখে পূজা করা হবে। দৈনন্দিন জীবনে বাঁধা হিসেবে আবদ্ধ বাঙালি আসলে পূজার চার দিনে মুক্তির ছোঁয়া পায়। সারা বছরে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছে ডানাগুলো এদিক-ওদিক থেকে বেরিয়ে আসে। খুশিয়াল মেজাজে ভর করে তাদের চার দিন অবাধ ওড়াউড়ির সমাপ্তি হলো মঙ্গলবার। আবার তাদের গুটিয়ে যাওয়ার পালা। এবার ফিরে চলা প্রতীক্ষার কাছে। তবে মনের মধ্যে অবিরাম ঢাকের বাদ্যি জানান দিয়ে যায়, আসছে বছর আবার হবে।
দৈনিক সময়ের সমীকরণ-এর দৈনন্দিন পরিদর্শন রিপোর্ট অনুযায়ী, সার্বজনীন এ উৎসবের প্রত্যেক দিনই সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের সব বয়সের নারী-পুরুষ ম-পে ম-পে গিয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেন। পাশাপাশি দুর্গতিনাশিনী দেবীদুর্গার কৃপা লাভের আশায় তারা আরাধনা করেন। প্রতিবারের ন্যায় এ বছরও দুর্গাপূজা উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরসহ গোটা জেলায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি পূজাম-পে শ্রেণি বিন্যাসে বিপুলসংখ্যক আনসার, ব্যাটালিয়ন পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। বসানো হয় অস্থায়ী কন্ট্রোলরুম ও ক্লোজ সার্কিট টেলিভিশন ক্যামেরা (সিসি টিভি)। বিসর্জনের ঘাটগুলোতে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পক্ষ থেকে ছিল পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। নিরাপত্তা বিবেচনায় লাগানো হয় সিসি টিভিও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পরিদর্শনে প্রশানের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদেরও ম-পে ম-পে ঘুরতে দেখা গেছে। সেই সঙ্গে শুভেচ্ছাবিনিময়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার, পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলামসহ জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্টজনেরা।
দর্শনা:
দর্শনাতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সব থেকে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে দর্শনা কেরুজ পূজা মন্দির, আমতলা পূজা মন্দির, পুরাতন বাজার পূজা মন্দির, রামনগর দাসপাড়া পূজা মন্দির, রামনগর মুচিপাড়া পূজা মন্দির ও পারকৃষ্ণপুর হালদারপাড়া পূজা মন্দিরে প্রতিমা দর্শনা মেমনগরে মাথাভাঙ্গা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দর্শনা পৌরসভার মেয়র মতিয়ার রহমান, প্যানেল মেয়র-১ রবিউল হক সুমন, প্যানেল মেয়র-২ রেজাউল ইসলাম, প্যানেল মেয়র-৩ জাহানারা বেগম, কাউন্সিলর খালেকুজ্জামান, মনির সর্দার, নজরুল ইসলাম, কানচু মাতবর, চান্দু মাস্টার, মঈনউদ্দীন আহম্মেদ মণ্টু, সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর আম্বিয়া খাতুন ফুট্টুরি, সুরাতন নেছাসহ স্থানীয় অনেকে।
জীবননগর:
জীবননগরে বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলার বিভিন্ন স্থানের পূজাম-পের প্রতিমাগুলো গাড়িতে করে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরিয়ে ভৈরব নদীতে দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ বছর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মোট ২৬টি পূজাম-পে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এক বছরের জন্য বিদায় জানানো হলো দেবী দুর্গাকে। প্রায় সারা দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলে শেষ আনন্দ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেহেরপুরের ভৈরব নদীতে ঢাকের তালে এবং উলুধ্বনি দিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমাগুলো। মেহেরপুর শহরের থানা ঘাট ও শ্বশ্মান ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হয়। এর আগে প্রতিমাগুলোকে নিয়ে মেহেরপুরের বিভিন্ন সড়কে ঘোরানো হয়। উৎসবের শেষ লগ্নে আনন্দে মেতে উঠে ভক্তরা। নির্বিঘেœ দেবী দুর্গাকে বিসর্জন দিতে পেরে খুশি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মহাসমারোহে পাঁচ দিন ধরে উদ্যাপিত হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসব। এ বছর মেহেরপুরে ৪১টি ম-পে দুর্গাপূজার আয়োজন করা। এর মধ্যে মেহেরপুরে ১৩টি, গাংনীতে ২২টি এবং মুজিবনগরে ৬টি।
বারাদী:
মেহেরপুর সদরের মোমিনপুরে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে আমঝুপি কাজলা নদীতে দেওয়া হয় প্রতিমা বিসর্জন। এ সময় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ গানের তালে নেচে ও বাজনা বাজিয়ে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে যায় কাজলা নদীর তীরে। এরপর নদীতে দেওয়া হয় প্রতিমা বিসর্জন।