বাইরে করোনার ভয়, বাড়িতে খাবার পানির সঙ্কট

101

কালীগঞ্জে ভ‚গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে নিচে, ভোগান্তি চরমে
রিয়াজ উদ্দীন, কালীগঞ্জ:
এসে গেছে বৈশাখ। কিন্তু এখনও দেখা মেলেনি ভারি বৃষ্টির। দুই-এক দিন আকাশে মেঘ জমলেও তা ঝড়ো বাতাস আর ধুলা শান্ত করা ছিটেছাটা বৃষ্টিতে রুপ নিয়েছে। যে কারণে ছোট-বড় জলাশয়গুলো আজ শুকিয়ে ঠনঠনে। এমন অবস্থায় ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অতিদ্রæতই নিচে নেমে গেছে। এতে অকেজো হয়ে পড়েছে গভীর ও অগভীর অসংখ্য নলক‚প। ফলে গৃহস্থলির কাজে ব্যবহৃত ও খাবার পানি নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন বেশির ভাগ পরিবারের মানুষ। আবার নাবী (পরে রোপনকৃত) বোরো খেতের শেষ মুহূর্তের সেচে ঝামেলার অন্ত নেই। বিগত কয়েক দিনের প্রচÐ দাবদাহে সকালে খেতে সেচ দিলে পরের দিনই তা শুকিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যমগুলোতে আবহাওয়ার খবরে বৃষ্টির সংকেত দিলেও বাস্তবে এ অঞ্চলে বৃষ্টির দেখা নেই। শেষ মুহূর্তের বোরো খেত ঠেকাতে কৃষকদের অনেকে বাধ্য হয়ে ৮-১০ ফুট মাটি খুঁড়ে গর্তের মধ্যে স্যালোমেশিন বসিয়ে পানির স্তর পেতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্যে, করোনার মহামারি থেকে বাঁচতে সবাই চাচ্ছেন নিজ ঘরে অবস্থান করতে। কিন্ত নলকূপগুলোতে পানি না থাকায় তারা পড়েছেন বেশ ঝামেলায়। সরকারি ও স্বাস্থ্যবিভাগের নির্দেশনা এখন বেশি করে হাত ধুতে হবে। পরিস্কার রাখতে হবে পরিধান ও বিছানাপত্রের কাপড়চোপড়। কিন্ত নলকূপে পানি না ওঠাই চরম বিপাকে তাঁরা। এখনও যেসব বাসাবাড়ির নলক‚পে পানি উঠছে, সেখান থেকে নিয়মিত পানি নিতে যাওয়াটাও সবার জন্যই ঝামেলা। মোট কথা, একটি পরিবারের জন্য যে পানি প্রয়োজন হয়, তার পরিমাণটাও একেবারে কম নয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য অফিসসূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জরিপ মতে, কালীগঞ্জ উপজেলায় মোট ২৯ হাজার ৫৬৩টি অগভীর নলক‚প রয়েছে। আর গভীর নলকূপ আছে ৩৮৪টি। গ্রীষ্মের শুরুতে প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরেও পানির স্তর বেশ নেমে গেছে। ফলে অনেক নলকূপে পানি উঠছে না। অফিসসূত্রে আরও জানা গেছে, বোরো চাষের কিছু কিছু এলাকাতে ৩৫ থেকে ৩৮ ফুট পর্যন্ত পানির স্তর নেমে গেছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার বেজপাড়া গ্রামের বেজপাড়ার কৃষক আমিরুল ইসলাম জানান, তাঁদের গ্রামের বাসা-বাড়ির বেশিরভাগ নলক‚পগুলোতে পানি উঠছে না। মোটরের মাধ্যমেও ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মহল্লার অধিকাংশ পরিবার বাড়ি থেকে বেশ খানিক দূরের একটি সাব মার্সেপল মোটর থেকে পানি এনে খাবার পানির চাহিদা মেটাচ্ছেন। মহল্লাবাসীর পানির হাহাকারে ওই মোটরের মালিক স্বপ্রণোদিতভাবে সকাল ও বিকেল পানির ব্যবস্থা করছেন। ফজলুর রহমান জানান, মহল্লার দু-একটি পরিবারের নলকূপে পানি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও চলমান লকডাউন পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী হলেও তাঁদের বাসা-বাড়িতে যাওয়াটাও উভয়রই কাছে অনিরাপদ। তিনি বলেন, পানির অভাবে গোসল ও গৃহস্থলীর কাজের জন্য প্রতিনিয়ত ঝামেলা পোহাচ্ছেন। যত দিন ভারি বর্ষা না হবে, ততদিন এমন অবস্থা বিরাজ করবে বলে তাঁরা মনে করছেন।
এদিকে, উপজেলার আলাইপুর গ্রামের কৃষক মতলেব মিয়া জানান, মাঠে দোল খাওয়া বোরো খেতের ধান তাঁদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্ত এ মৌসুমের শেষের দিকে এসে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। অল্প কিছুদিন পরেই ধান কাটা শুরু করা যাবে। কিছু কিছু খেতের ধান লাল হতে শুরু করেছে। তবে কিছু খেত আছে অনেক পরে লাগানো। সে খেতগুলোতে এখনও বেশ কয়েকটি পানি সেচ লাগবে। কিন্ত মেশিনে যেভাবে পানি উঠছে, তাতে খুব সমস্যা হচ্ছে। ষাটবাড়িয়া গ্রামের নান্নু মেম্বার জানান, আগে রোপন করা কিছু ধানখেত কাটার উপযোগী হলেও অধিকাংশ নাবী (পরে রোপনকৃত) বোরো খেতে এখনও চলছে শেষ মুহূর্তের সেচকাজ। কিন্ত পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঠিকমতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। তিনিসহ গ্রামের বেশিরভাগ কৃষক ১০-১২ ফুট গভীর করে খুঁড়ে স্যালোমেশিন বসিয়ে খুব কষ্ট করে বোরো খেতের শেষ মুহূর্তের সেচ কাজ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, শুধু তাঁদের মাঠেই নয়, এলাকার সবাই বোরো খেতের মাঠগুলোতে একই অবস্থা।
কালীগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী জেসমিন আরা জানান, গ্রীষ্মের সময় এ অঞ্চলের পানির স্তর প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ ফুট নিচে নেমে যায়। এ অবস্থা হলেও পানি পাওয়া সম্ভব। কিন্ত এ বছর একটু আগে থেকেই পানির স্তর ৩০-৩৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। যে কারণে অনেক অগভীর নলক‚প অকেজ হয়ে পড়েছে। আবার গভীর নলকূপগুলোতেও এখন অপেক্ষাকৃত কম পানি উঠছে। তিনি আরও জানান, গত সপ্তাহে উপজেলার বারবাজারের একটি গ্রামে পানির স্তর মেপে দেখা গেছে ৩২ ফুট নিচেই নেমেছে পানির স্তর। যে কারণে এ এলাকার অনেক নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। ফলে সঙ্কট দেখা দিয়েছে খাবার পানির। এমনটি হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ বছর এখনও কোনো ভারি বৃষ্টি না হওয়াই পুকুর খালবিলের জমে থাকা পানি শুকিয়ে গেছে। অনেক গ্রামের কৃষকেরা স্যালোচালিত গভীর নলক‚পগুলো মাটি খুঁড়ে বেশ গভীরে বসিয়েও তেমন একটা পানি পাচ্ছেন না, এমন খবর তাঁরাও প্রতিনিয়ত পাচ্ছেন। তবে অল্পদিনের মধ্যে বৃষ্টি হলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।