বাংলাদেশে কর্মরত চীনাদের নিয়ে শঙ্কা

34

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত আছেন প্রায় আড়াই হাজার চীনা নাগরিক। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নববর্ষের ছুটি নিয়ে গিয়েছেন চীনে। আগামী সপ্তাহেই তারা বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করার কথা। অন্যদিকে চীনে বর্তমানে ভয়ংকর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে করোনাভাইরাসের। এ অবস্থায় ছুটি শেষে ফিরে আসা প্রকল্পে কর্মরত চীনাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশী প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
সূত্র বলছে, শুধু বিসিপিসিএল নয়, বাংলাদেশে চলমান বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রায় সবগুলোতেই জড়িত আছেন অনেক সৈনিক। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় লাখেরও বেশি চীনা কর্মী কর্মরত রয়েছেন। এদের বেশির ভাগই ছুটি নিয়ে আসা-যাওয়া করেন। এসব চীনার অনেকেই এখন নববর্ষের ছুটিতে চীনে অবস্থান করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেরত আসার পর তাদের মাধ্যমে উহান ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল বিসিপিসিএল প্রকল্প এলাকায় করোনাভাইরাস প্রসঙ্গে চীনা কর্মীদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৫০০ চীনা কর্মী বর্তমানে ছুটি নিয়ে চীনে অবস্থান করছেন। চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন এরাই। বিসিপিসিএলের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক শাহ আবদুল মাওলা বলেন, বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার প্রকল্পের সব মেশিনারি বা যন্ত্র এরই মধ্যে আমদানি করা শেষ হয়েছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের উপকরণেরই আমদানি সম্পন্ন হয়েছে। কাজেই আমদানি করা উপকরণের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে আশঙ্কা আছে প্রকল্পে কর্মরত চীনাদের নিয়ে। বর্তমানে চীনা নতুন বছরের ছুটি চলমান আছে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই ছুটিতে থাকা কর্মীরা বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করার কথা। তাদের ফিরে আসাই উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। কারণ মানুষের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণ হওয়ার শঙ্কা কোনোভাবেই অমূলক নয়। আমি চীনের বেইজিংয়ে বর্তমানে অবস্থানরত একজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের বেশির ভাগই বেইজিংসহ আরো উত্তরে অবস্থান করছেন। তার পরও তাদের ফিরে আসা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।
চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়েও শঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, এমন এক সময়ে করোনাভাইরাসের আক্রমণ হলো, যখন চীনে ছুটি চলছে। বাংলাদেশে যেসব পণ্য আমদানি হয়, তার একটি অংশ ছুটি শুরুর আগেই রফতানি করেছে চীনারা। সৌভাগ্যবশত ছুটি চলাকালে ভাইরাস আক্রমণের ব্যাপ্তি বেড়েছে। তার পরও চীনারাই ভাইরাস আক্রমণ-সংক্রমণ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশেও এখন এ নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সেক্রেটারি জেনারেল শাহজাহান মৃধা বলেন, করোনাভাইরাসটি মানুষে মানুষেই সংক্রমিত হয়। কোনো পণ্যের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণ হয় কিনা সে বিষয় সম্পর্কে আমরা এখনো অবগত নই। আগামী ২ ফেব্রুয়ারির পর থেকে তারা কর্মক্ষেত্রে ফিরতে শুরু করবেন। উহানসহ তিন-চারটি প্রদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে। এ অঞ্চলগুলোর দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি আছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। ফলে নানা পন্থায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা করছেন বাণিজ্যসংশ্লিষ্টদের অনেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণের উৎপাদন না থাকায় বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয় ছিল ৫ হাজার ২১৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। এর ২৬ শতাংশই ব্যয় হয়েছে চীন থেকে আমদানীকৃত বিভিন্ন পণ্যের বিপরীতে।
তবে পণ্যের চেয়ে মানুষ নিয়েই আতঙ্কটা তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেহেদী আলী বলেন, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ চীনা কর্মী কাজ করেন। আশঙ্কাটা এদের নিয়েই সবচেয়ে বেশি। এদিকে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় চীনা পণ্যের এবং যন্ত্র-যন্ত্রাংশের প্রদর্শনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত খোদ চীনারাই। আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে কয়েকটি প্রদর্শনীর আয়োজন হওয়ার কথা রয়েছে। এসব আয়োজনের চীনা অংশীদাররা এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন, প্রদর্শনীগুলোর আয়োজন হবে কিনা এবং হলেও সেখানে চীনারা অংশ নিতে পারবেন কিনা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশে চীনাদের আগমন নিয়ে সরকারের কোনো অবস্থান আছে কিনা, সে বিষয়েও জানতে চাইছেন অনেকে। আবার প্রতিবেশী দেশ ভারতেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে চীনের মতো ভারত নিয়েও কিছু আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট মহলে।