বর্জন নয়, নির্বাচনে অংশগ্রহনে বিএনপির প্রস্তুতি

166

তফসিলের হাঁকডাক : জোর করে কাউকে নির্বাচনে আনা হবে না- আ.লীগ
সমীকরণ ডেস্ক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে সংশয় ততই তীব্র হচ্ছে। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজেদের অবস্থানে অনড়। এরই মধ্যে পরিবেশ তৈরি ছাড়াই অক্টোবরে তফসিল ঘোষণার হাঁকডাক একতরফা নির্বাচনের ইঙ্গিত বলেই মনে করছে বিএনপি। বিএনপি আপাতত নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। আগে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে চাইছে তারা। অক্টোবরে তফসিল ঘোষণার হাঁকডাক ক্ষমতাসীনদের ‘কৌশল’ হিসেবেও দেখছেন দলটির নেতারা। বিএনপি নেতাদের দাবি, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশের ওপর নির্ভর করছে তফসিল। তাই পরিবেশ তৈরি না হলে তফসিল কোন মাসে ঘোষণা করা হলো তাতে কিছু যায় আসে না। একতরফা নির্বাচনের তফসিলের কোনো গুরুত্ব নেই। তাদের মতে, আগে থেকে এ ধরনের কথা বলে বিভিন্ন দলের মনোভাব জানার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীনরা। কারণ, মুখে যাই বলুক আরেকটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিয়ে আওয়ামী লীগে ভীতি কাজ করছে। চলতি বছরের অক্টোবরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম।
এদিকে, নির্বাচন বর্জনের পথে আর হাঁটবে না বিএনপি। যেকোনো মূল্যে কিছু দাবি-দাওয়া আদায় হলে এবং নিজেরা কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে যাবে দলটি। দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের মতো আর ভুল করবে না সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি। এবার সরকারকে খালি মাঠ ছেড়ে দিতে নারাজ তারা। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েই কারাগার থেকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আগামী নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শীর্ষ নেতাদের। গত শনিবার কারাগারে দলের তিন শীর্ষ নেতা সাক্ষাৎ করতে গেলে এসব পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। একইসঙ্গে তার মুক্তির জন্য আইনি লড়াই, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা, সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবিতে অনড় অবস্থান ব্যক্ত করে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
ওই দিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খান। অবশ্য নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়ার নির্দেশনা সম্পর্কে কৌশলগত কারণে তাদের কেউই প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি নন। দলের নীতিনির্ধারক এ নেতারা জানিয়েছেন, দাবি-দাওয়া আদায়ের প্রশ্নে সরকারকে চাপের মুখে রেখে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ অন্তত কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে দলটি। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও ভেতরে ভেতরে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের ঢাকায় কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। গোপনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশও সফর করছেন তারা। কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারী নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে নেওয়া এবং সর্বাত্মক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। একইসঙ্গে তিনি সারাদেশে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীর সাংগঠনিক তৎপরতা আরও গতিশীল করার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০ দলীয় জোটকে আরও কার্যকর করার ও জোটের বাইরের দলগুলোকে নিয়ে পৃথক প্ল্যাটফর্ম বা পৃথক নির্বাচনী মোর্চা গঠনের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে তারা নির্বাচনে যাবেন না। মুক্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হলে নির্বাচনে যেতে পারেন। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সংকটের সমাধান ছাড়া কোনো নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে না। আলোচনায় বসতে হবে। দাবি মানা হলে নির্বাচনে যাবেন তারা। তবে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথাও বলেন, যেকোনো সময় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে বিএনপির। প্রতিটি আসনে ৩ থেকে ৫ জন সম্ভাব্য যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। এখানে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য নতুন করে চেয়ারপারসনের নির্দেশনারও প্রয়োজন নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দলের চেয়ারপারসন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চলমান আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে চেয়ারপারসন কোনো নিদের্শনা দিয়েছেন কি-না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে চিন্তা করার সময় এখনও আসেনি। তবে নির্বাচনের জন্য দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরা এমনিতেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অবশ্য বিএনপির দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো আমলে নিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাদের ভাষায়, সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাতে কোন দল আসবে, কোন দল আসবে না- সেটা দেখার কিছু নেই। বুধবার জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমনই বক্তব্য দেন। তিনি বলেছেন, জোর করে কাউকে নির্বাচনে আনা হবে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে ডাক পাবে না বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংসদে থাকা দলগুলোকে নিয়ে গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানোরও পরিকল্পনা নেই সরকারের।
বিএনপির বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা জানিয়েছেন, দেশি-বিদেশি শুভাকাঙ্খীরা যেভাবেই হোক বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। বিএনপিও সেটাই চায়। বিগত নির্বাচন বর্জন ভুল হয়েছে বলে শুভাকাঙ্ক্ষীদের বক্তব্যের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের অনেকেই একমত। নির্বাচন বর্জনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চায় তারা। বিএনপি সূত্র জানায়, এসব নানা হিসাব-নিকাশ এবং দেশি-বিদেশি শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শ সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন কারাবন্দি খালেদা জিয়া। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েও বিগত নির্বাচন বর্জনের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য দলীয় নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন। সূত্র জানায়, আরও আগে থেকেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে নির্বাচনের মেনিফেস্টো তৈরি, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর একাধিক জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। ২০ দলীয় জোটের পাশাপাশি জোটের বাইরে থাকা দলগুলোকে নিয়ে পৃথক নির্বাচনী মোর্চা গঠনেরও চেষ্টা চলছে। যার অংশ হিসেবে আজ বিএনপি সমর্থিত সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতাদের সঙ্গে গণফোরামের চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেন মতবিনিময় সভায় যোগ দিচ্ছেন।