প্রধানমন্ত্রীর ‘একক ক্ষমতায়’ ভারসাম্য আনা হবে

282

d9124a88বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলটির রূপকল্প ২০৩০ ঘোষণা
প্রধানমন্ত্রীর ‘একক ক্ষমতায়’ ভারসাম্য আনা হবে
সমীকরণ ডেস্ক: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি ‘স্বৈরচারী একনায়কতান্ত্রিক’ শাসনের জন্ম দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে বিদ্যমান অবস্থার অবসানকল্পে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে। গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপির ‘ভিশন ২০৩০’ নামের রূপকল্প ঘোষণা করছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, বিএনপির বিশ্বাস করে জনগণ সব উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। যেসব বাধা জনগণের মেধা, শ্রম, উদ্যোগ ও উৎসাহকে দমিয়ে দেয় সেগুলোকে দূর করে বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, আধুনিক ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি ‘ভিশন ২০৩০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। খালেদা জিয়া বলেছেন, সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে। বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃস্থাপন করা হবে, জাতীয় সংসদকে সব জাতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা,জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে জাতির কাছে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এ জন্য সুনীতি, সুশাসন ও সুসরকারের সমন্বয় ঘটাবে বিএনপি। দলটি রাজনৈতিক সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটাতে চায়।
রূপকল্পের মধ্যে আরও রয়েছে দেশের জনগণের হাতে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে চায় বিএনপি, দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল এর পদ সৃষ্ট করা হবে, জনপ্রশাসন, বিচার, পুলিশ, ও কারাগার-এ চার প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছ, দক্ষ, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে, সব ধরনের কালাকানুন বাতিল করা হবে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম, ও খুন এ অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অবসান ঘটানো হবে, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করা হবে।
সুশাসনের প্রসঙ্গে রূপকল্পে আরও বলেন, মানবাধিকার সম্পর্কিত জাতিসংঘের সর্বজনীন ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হবে,দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্ব ওঠে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম, বিচার-বোধ ও সুনামের কঠোর মানদ-ে যাচাই করে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ করা হবে, অধস্তন আদালতকে নির্বাহী বিভাগের আওতামুক্ত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় স্থাপন করা হবে, সমস্ত বিচার প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়াকে পরিপূর্ণভাবে ইলেকট্রনিক/ অললাইন ব্যবস্থায় আনা হবে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে মামলার জট কমিয়ে আনা হবে, বিচার ব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য উচ্চ পর্যায়ের জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে, পুলিশ বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে, পুলিশের কনস্টেবল / ট্রাফিক পুলিশ এবং এএসআই পর্যন্ত নিম্নপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে একটানা ৮ ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব দেওয়া হবে না, দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতাদি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে, একটি দক্ষ, স্বচ্ছ, গতিশীল, মেধাবী জবাবদিহিমূলক যুগোপযোগী ও গণমুখী জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে। প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করা হবে। পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে বলেন, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। পরিষেবা প্রসঙ্গ খালেদা জিয়া বলেন, সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাসমূহের সেবার মান ক্রমান্বয়ে বাড়ানো হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বার্ধক্যের দুর্দশা লাঘবের জন্য আইনের প্রণয়নের মাধ্যমে একটি ‘পেনশন ফান্ড’ করা হবে। বাস-ট্রেন-লঞ্চে বিনা ভাড়ায় প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের বিধান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিএনপি সব মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করবে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নের নামে দুর্নীতির অবসান ঘটানো হবে।
রূপকল্প ২০৩০-এর যুব, নারী ও শিশু অংশে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি বেকার যুবশক্তিকে উৎপাদনশীল কর্মকা-ে নিয়োগের জন্য দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের চাহিদার নিরিখে যুবসমাজকে যথাযথভাবে দক্ষ ও সক্ষম করে তুলবে। যুব উদ্যোক্তাদের বেশি বেশি করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সমর্থন, স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ এবং কর ছাড় দেওয়া হবে। নারী উদ্যোক্তাদের প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ গ্রহণের পথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের অধিকতর উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সমর্থন, স্বল্প-সুদে ব্যাংকঋণ এবং কর-ছাড় দেওয়া হবে। অধিক সংখ্যক ডে-কেয়ার সেন্টার খালেদা জিয়া বলেছেন, শিশুসন্তান রেখে নারীরা যাতে নিশ্চিন্তে কাজে মনোনিবেশ করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুব, নারী ও শিশুদের জীবন বিকাশের চাহিদার নিরিখে যথোপযুক্ত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হবে। জাতীয় উন্নয়নে যুব ও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে নারীর অবদানকে বিএনপি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করে। দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য বিএনপি সকল কর্মকা-ে নারীসমাজকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করবে। এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে সকল বাধা অপসারণ করা হবে। খালেদা জিয়া বলেন, নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রথা, এসিড নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচাররোধে কঠোর কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিশু-শ্রম রোধে কার্যকর বাস্তবানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

এ ছাড়া সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ইচ্ছে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হবে, জাতীয় টিভিতে একটি পৃথক শিক্ষা টিভি চালু করা, স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং তথ্য প্রযুক্তি খাত বিএনপি বিশেষ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে ২৫৬টি পয়েন্ট তুলে করা হয় রূপকল্পে।