প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ

69

বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি, নিবন্ধিত যানবাহনের অর্ধেক চালকের লাইসেন্স নেই, আহত ৭০ শতাংশই নগর ভিক্ষুক
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ। এ সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় একটি মৃত্যুর সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোটা পরিবারেরই যেন মৃত্যু হয়। সড়ক দুর্ঘটনা বাড়লেও প্রতিরোধের তেমন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। সড়ক, যানবাহন ও দক্ষ চালক- পরিবহন খাতে শৃঙ্খলার তিন মূল নিয়ামক। কিন্তু দেশের এর কোনোটিই ত্রুটিমুক্ত নয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, অদক্ষ চালক আর অপরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দৈনিক গড়ে মারা যাচ্ছেন ২০ জন। আর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এর জন্য তারা ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, সড়কে অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন। আর এ দুর্ঘটনা বাড়তে থাকলে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে বাধার সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২৪ হাজার ৯৫৪। পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২২৬ জন। আর আহতের সংখ্যা ১২২। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৯৪টি। ফেব্রুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৯৯। আহত ১৫৭। মামলা হয়েছে ১৬১টি। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ২ হাজার ৬৩৫ জন এবং আহত হন ১ হাজার ৯২০ জন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জাতীয় ঐক্যের প্রকাশিত সড়ক বার্তায় বলা হয়, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ধরন ও মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। আহত-নিহতের সঠিক চিত্রও পুলিশ রেকর্ডে উঠে আসে না। তবে দেশের শহরাঞ্চলে মোট নিহতের ৭০ শতাংশই পথচারী। সারা দেশে এ হার ৫৪ শতাংশ। তবে ঢাকা শহরে যত পঙ্গু ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষ পাওয়া যায় তার ৭০ ভাগই সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারানো বলে জানিয়েছে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছরের গত তিন মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ১ হাজার ৪৯টি। এতে মারা গেছেন ১ হাজার ১৭৩ জন। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯৯১ জন। ট্রেন দুর্ঘটনা ৪৭টি। এতে নিহত ৫০ ও আহত হয়েছেন ৮ জন। নৌ দুর্ঘটনা ঘটে ৩৫টি। এতে নিহত ১৭ ও আহত হয়েছেন ৪৮ জন।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ৬২ শতাংশে যথাযথ সাইন-সংকেতের ব্যবস্থা নেই। জাতীয় মহাসড়কের অন্তত ১৫৪ কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর হিসাবমতে, দেশে ৩৮ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ৫ লাখের মতো। আর লাইসেন্সধারী চালক প্রায় ১৬ লাখ। বাকি সব যানবাহন ভুয়া চালক দিয়ে চলছে। অর্থাৎ ৪৭ শতাংশের বেশি চালকের লাইসেন্স নেই। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত হওয়া দুর্ঘটনা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউট (এআরআই) জানায়, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন করে। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এ দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এসব তথ্য রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন ও এআরআইর যৌথ গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে সংঘটিত ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট ছিল। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে দুর্ঘটনা ঘটে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাসের দুর্ঘটনা ২৫ শতাংশ। কার, মাইক্রোবাস ১৫ শতাংশ। তবে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আরেক সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বাংলাদেশের হিসাবে, গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৩ হাজার ৩৬৭ জন। আহত হয়েছেন ১৯ হাজার ১৫৮ জন।
রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের জন্য সরকারের আলাদা কোনো বাজেট নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার বাজেট এ খাতে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঢাকায় যানজটের কারণে গাড়ির গতি থাকে ৫ কিলোমিটার। এর পরও এখানে দুর্ঘটনার কারণ প্রতিযোগিতা। যখন ট্রাফিক সিগন্যাল ছেড়ে দেয়, কিংবা রাস্তা সামান্য ফাঁকা পায় তখনই চালক বেপরোয়া গতিতে চালাতে চান। আর তখনই মানুষের প্রাণহানি হয়। তবে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।