পৈশাচিকতা বাড়ছেই

36

৬ মাসে ৬৩০ নারী ধর্ষণের শিকার
সমীকরণ প্রতিবেদন:
এরশাদ সিকদার, মোকিম গাজীরা নেই; কিন্তু পৈশাচিক কায়দায় খুন, নৃশংসতা, ধর্ষণ করে নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা কমেনি। এক সময়ের ভয়ঙ্কর অপরাধী এরশাদ সিকদার-মোকিম গাজীদের অবস্থান এখন যেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সর্বত্রই একই চিত্র। প্রতিদিন মিডিয়ায় খুন-ধর্ষণ-নির্যাতনের লোমহর্ষক কাহিনীর খবর প্রকাশ পাচ্ছে। একটি লোমহর্ষক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে ঘটছে আরেক ঘটনা। ডিজিটালের এই যুগে মানবিকতা লোভ পেয়ে মানুষের মধ্যে নিষ্ঠুরতা যেন ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ এ জন্য দায়ী করছেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতাকে। কেউ কেউ অবশ্য ধর্মীয় ও নৈতিকতার শিক্ষার অভাবে তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধায় অবাধ মেলামেশা, ছেলেমেয়েদের মধ্যে বয়ফ্রেন্ড-গালফ্রেন্ড সংস্কৃতির প্রবর্তন এবং বিজাতীয় শিল্পচর্চাকে দায়ী করছেন।
জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ জন্য বিচারহীনতাকে দায়ী করছেন। তিনি বলেন, ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের একশ’টি অপরাধে গড়ে দুইটির বেশি শাস্তি হয় না। যেহেতু এসব মানবতাবিরোধী ঘটনার বিচার হয় না, তাই এমন বর্বর ঘটনা সমাজে বাড়বে, এটাই তো স্বাভাবিক। অভিন্ন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান এমরানুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, শিশু কিংবা নারী ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির কারণ মূলত বিচারহীনতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।
ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালেই দেখা যায় গত কয়েক মাসে খুন, ধর্ষণের অসংখ্য নৃশংশ ঘটনা ঘটেছে। সারাদেশের একই চিত্র; নৃশংস অপরাধ বেড়েই চলেছে। ধর্ষণ এবং নির্মমভাবে খুনের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে নিষ্ঠুরতা বাড়ছে গণিত্যিক হারে। যাতে পৈশাচিকতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। স্বামীর হাতে স্ত্রী, স্ত্রীর হাতে স্বামী, মায়ের হাতে সন্তান, বাবার হাতে ছেলে, চাচার হাতে ভাতিজা, ভাইয়ের হাতে ভাই-ঘরের ভিতর-বাইরে এসব খুনোখুনি এখন স্বাভাবিক ঘটনায় রূপ নিচ্ছে। খুনের পর লাশ রাখা হচ্ছে শয়নকক্ষে, বাড়ির পাশে ঝোপে, রাস্তায়, বালুর ভেতর, বস্তার ভেতর, কাদার ভেতর, ড্রেনে কিংবা ডাস্টবিনে। গত এক মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে গলা কেটে খুন করার শতাধিক ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন এক ডজন ধর্ষণের অভিযোগের তথ্য মিলেছে। সবচেয়ে বেশি যৌন পীড়নের শিকার হচ্ছে শিশু ও কিশোরীরা।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পিআর) মো. সোহেল রানা জানান, চাঞ্চল্যকর মামলাসমূহ নিবিড় তদারকির জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন আইজিপি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত মামলা মনিটর করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্যাতন সংক্রান্ত প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ১১টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ১১টি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) গত আড়াই বছরে ৩৮ হাজার ১২৪ জন নারী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৪২৮ জনই যৌন পীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতেই চিকিৎসা নিয়েছে তিন হাজার ৬০১ জন নারী ও শিশু। সেখানকার তত্ত্বাবধায়ক বিলকিস বেগম বলেন, অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এখানে চিকিৎসার আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। ধর্ষণ বাড়ছে কি না, সেটা বলা যাবে না, তবে ধর্ষণের সঙ্গে নির্যাতনের আলামত পাচ্ছি আমরা।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই হয়েছে ৪৯৬ জন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, চলতি বছরের ছয় মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয়েছে ২৬ শিশুর। ২০১৮ সালে পুরো বছরে ৩৫৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। এর মধ্যে মারা যায় ২২ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৭৩২টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬৩ জনকে। ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে তিন নারীকে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২০৩টি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮১টি। গত জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৯১টি। এ সংখ্যা আগের এক বছরের চেয়েও বেশি। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৬ জনকে। চেষ্টার পর হত্যা করা হয়েছে একজনকে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৮৪টি। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩২৩টি। ২০১৭ সালে ধর্ষণের মোট সংখ্যা ছিল ৮১৮ এবং ২০১৬ সালে ৭২৪টি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বেড়েছে কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ। এ বছর এই পরিসংখ্যান আরো অনেক বেড়ে যাবে।