পারিবারিক সহিংসতা রোধে নতুন করে ভাবতে হবে

130

আমাদের সমাজে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় চলছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হানাহানি বাড়ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহের কারণে অবলীলায় খুন হচ্ছে মানুষ। আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে পারিবারিক হত্যাকা-। মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল পরিবার কারো কারো জন্য মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি সন্তানের হাতে জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রাণহানিও ঘটছে। সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে ‘স্বামীর হাতে খুন হচ্ছে স্ত্রী, স্ত্রী গলা টিপে হত্যা করছে স্বামীকে। বন্ধুর হাতে বন্ধু খুন হচ্ছে। প্রেমিকাকে বাঁচাতে হাতে অস্ত্র তুলে নিচ্ছে প্রেমিক। বাসার ভেতরে শিশু খুন হচ্ছে। ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণ যাচ্ছে। পাওনা নিয়ে বিত-ায় কিশোরের শখের ছুরি ঢুকে যাচ্ছে বন্ধুর পেটে। ব্যক্তিস্বার্থ আর দ্বন্দ্বে সহোদর, নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবকেও খুন করা হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণ কিংবা সন্ত্রাসী ঘটনায়ও খুন হচ্ছে মানুষ। একের পর এক খুন হচ্ছে মানুষ। খুনের পর ধরা পড়ছে খুনিরা। তবুও থামছে না খুনের ঘটনা। সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই ঘটছে এসব খুনের ঘটনা। দিনে দিনে পাল্টাচ্ছে খুনের ধরনও। দিন দিন মানুষ আরো বেশি পাশবিক হয়ে উঠছে। সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা কমছে। এসবসহ বেশ কিছু কারণে পারিবারিক খুনের ঘটনা ঘটছে। আসলে নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার কারণে জীবনে বাড়ছে হতাশা, মানসিক বিষণন্নতা, আর্থিক দৈন্য। ফলে সমাজে বেড়ে চলেছে অপরাধও। সাধারণভাবে খুনখারাবি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকেই নির্দেশ করে। অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা বলবৎ থাকলে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে থাকারই কথা। আমাদের দেশে এক্ষেত্রে যে দুর্বলতা আছে তা অস্বীকার করতে পারি না। অনেক আলোচিত চাঞ্চল্যকর হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা বিচারহীন থাকছে দিনের পর দিন। আর সামাজিক অপরাধ প্রবণতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধও দরকার। এ ব্যাপারে সামাজিক অস্থিরতা ও অসহিষ্ণুতার কারণ অনুসন্ধান এবং তা দূরীকরণে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। দরকার পারিবারিক, সামাজিকক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। পরিবার হলো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু এখন পরিবারের মধ্যেও নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে পড়েছে। সামাজিক অবস্থার অপপ্রভাবে পরিবারের সদস্যদের একের প্রতি অপরের মমত্ববোধ হ্রাস পাওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে আপনজনের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দাম্পত্য কলহ, অর্থ লিপ্সা, মাদকাসক্তি ও অবৈধ দৈহিক সম্পর্কের কারণে। হত্যাকা- ঘটছে সামাজিক অবস্থা কত ভেঙে পড়লে নিজের আদরের সন্তানের হাতে জন্মদাতা পিতা-মাতার প্রাণহানি, যৌতুক কিংবা ক্ষুদ্র বিষয়ে স্বামীর হাতে স্ত্রীর খুন হওয়া, বড় আদরের ছোট ভাইকে নিজ হাতে জবাই এসব ঘটে চলেছে। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাব, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও মাদকের কারণে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন। দেখা যাচ্ছে সহিংসতার বিকাশ ঘটছে অবাধে। যেসব নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে সেখানে খুনিরা হয়তো কখনও খুনি ছিল না। এ ক্ষেত্রে আকাশ সংস্কৃতি, প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব ও নেশা জাতীয় দ্রব্যের বিস্তারের কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের জিঘাংসা ও মানসিক অস্থিরতা কাজ করে। এর ফলে ব্যক্তি খুনের মতো জঘন্যতম কাজ করতে পিছপা হয় না। কিন্তু এ ধরনের পৈশাচিকতা কখনও কাম্য হতে পারে না। এ বিষয়ে সরকারসহ আমাদের সবাইকে নতুন করে ভাবতে হবে। এ নিয়ে আরও কাজ করতে হবে। সর্বোপরি বিচারের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।