পাচারের অর্থ যাচ্ছে ১০ দেশে

70

* শীর্ষে সিঙ্গাপুর কানাডা ও মালয়েশিয়া
* বিনিয়োগে পরিবেশের অভাব
* রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা
* রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি
* আইনের শাসনের ঘাটতি
* বেপরোয়া দুর্নীতির কারণেই পাচার
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিবছর মোটা অঙ্কের অর্থ পাচার হলেও অদ্যাবধি নেই তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। এই পাচারের বেশির ভাগ অর্থ যায় সুনির্দিষ্ট ১০ দেশে। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কর কম এবং আইনের শাসন আছে-এমন দেশকেই বেছে নিয়েছে অপরাধীরা। এগুলো হচ্ছে: সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ড। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রিপোর্টে উঠে এসেছে এমন চিত্র। পাচারকারীরা দেশে রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে কয়েকজন পাচারকারী এবং বিভিন্ন দেশে পাঠানো তাদের অর্থ ফিরিয়ে আনতে পদক্ষেপ নিয়েছে দুদক। এছাড়া পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কানাডায় আন্দোলন শুরু করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে ৫ কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে: দেশে বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং বেপরোয়া দুর্নীতি। পাচার বন্ধ এবং আগে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগ না হওয়ায় দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের মোট বিনিয়োগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশ নেই, যে কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। অনেকেই এদেশে টাকা রাখতে নিরাপদ মনে করেন না। তাই টাকা বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, টাকা কারা পাচার করছে, সবার আগে তা চিহ্নিত করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ একবার বিদেশে টাকা গেলে তা ফেরত আনা খুব কঠিন। তিনি আরও বলেন, সরকার তার ভাবমূর্তি হারানোর ভয়ে তথ্য লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এগুলো করে লাভ হয় না। কারণ ভাবমূর্তি শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয় না। জানতে চাইলে দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ গতকাল বুধবার বলেন, দুর্নীতি ও পাচার রোধে আমরা কাজ করছি। তবে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনটি ২০১৫ সালে সংশোধন করা হয়েছে। এতে দুদকের ক্ষমতা কমিয়ে আমাদের কাজের আওতা ছোট করে দেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুসারে আমরা শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও টাকা পাচার নিয়ে কাজ করতে পারি। আর আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি।
সিঙ্গাপুরে বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের টাকা পাচারের ব্যাপারে তিনি বলেন, এগুলো দুদকের আওতার বাইরে, যা সিআইডি দেখছে। টাকা পাচার নিয়ে আন্তর্জাতিক ৪টি সংস্থার রিপোর্টেও বাংলাদেশ থেকে ভয়াবহ আকারে টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাগুলো হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), সুইস ব্যাংক, ইউএনডিপি এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন আইসিআইজের পানামা ও প্যারাডাইস পেপার। জিএফআইর রিপোর্ট অনুসারে গত বছর দেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশটিতে বাংলাদেশিদের আমানত সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সে ৮৪ জন বাংলাদেশির টাকা পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশ থেকে যেসব টাকা পাচার হয়, তা যায় উন্নত ৩৬ দেশে। এর মধ্যে উল্লিখিত ১০ দেশ চিহ্নিত করেছে বিএফআইইউ ও দুদক। মূলত এসব দেশেই বড় অংশ পাচার হয়।
দেশের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি বিদেশে টাকা পাচার করেছেন বলে ইতোমধ্যেই সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ‘ধীরে চল নীতি’ অনুসরণ করছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কয়েকজন ব্যবসায়ীর ১ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ করেছে দুদক। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে বাংলাদেশি একটি আলোচিত গ্রুপ সিঙ্গাপুরে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকায় একটি হোটেল কিনেছিল। ওই গ্রুপটিই ২০১৬ সালে দেশটিতে ৭৮৬ কোটি টাকায় আরও একটি হোটেল কিনেছে। একই গ্রুপ কানাডায় আবাসন খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে বলে ওই দেশের একটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। এছাড়া ২০১৮ সালে শীর্ষ ৫০ জন ধনীর নাম প্রকাশ করে সিঙ্গাপুরের সরকার। সেখানে ৩৪ নম্বরে স্থান পায় আরেকটি গ্রুপের চেয়ারম্যানের নাম। সেখানে টাকার পরিমাণ দেখানো হয় ৯১ কোটি ডলার বা ৭ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে যান পিকে হালদার। এই অর্থের একটি বড় অংশই পাচার করা হয়। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হওয়া ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুরে ২২৭ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছে দুদক। এ বছর ২১ আগস্ট দুই হাজার কোটি টাকা পাচারের মামলায় ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহামুদ শামীমকে গ্রেফতার করে সিআইডি। একই জেলার দুই হাজার কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে অর্জন ও পাচারের অপরাধে ২৬ জুন শহর আওয়ামী লীগের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও তার ভাই ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের বিরুদ্ধে ঢাকায় সিআইডি মামলা করেছে। অফশোর ব্যাংকিংয়ের নামে ২০১৪-২০১৬ সালে ২৩৬ কোটি টাকা দুবাই ও সিঙ্গাপুরে পাচার করেন এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াহিদুল হক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামীম আহমেদ চৌধুরী। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। অর্থ পাচার করে বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়া সরকারের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাড়ি করেছেন।
প্রবাসীরা বলছেন, সেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার। তারা সেখানে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগও করেছেন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসে কার্যক্রম শুরু করে কয়ি রিসোর্ট অ্যান্ড রেসিডেন্স। এর মালিক বাংলাদেশের বহু বিতর্কিত একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্ক, লাসভেগাস, আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড ও ব্যাংককেও এই হোটেলের শাখা রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে এই পরিবারের বিনিয়োগ রয়েছে। আরব আমিরাতে বড় অঙ্কের টাকা পাচার করেছে বেসরকারি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এছাড়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের বিশাল পরিমাণ সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, টাকা পাচারের প্রধান কারণ মূলত দুর্নীতি। কারণ ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দেশে রাখা সম্ভব নয়। এগুলো পাচার হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, কোনো ব্যবসায়ীর যদি অনেক টাকা হয়, সেক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সুযোগ যদি না থাকে, তাহলে বিদেশে পাচার করে। তৃতীয়, দেশে ভয়ভীতির কারণে অনেকে টাকা নিয়ে যায়। তবে কারণ যা-ই হোক, পাচার রোধে আমাদের সাফল্য নেই। তিনি বলেন, এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য আমাদের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট আছে। তারা এ বিষয়ে কী করছে, তা আমাদের জানা নেই। জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের অন্যতম গন্তব্য কানাডা। দেশটির সরকারি সংস্থা ফিনট্র্যাক (দ্য ফিন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশনস অ্যান্ড রিপোর্ট অ্যানালাইসিস সেন্টার অব কানাডা) সন্দেহভাজন আর্থিক লেনদেন দেখাশোনা করে। সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়া সংস্থাটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনার মধ্যেও গত এক বছরে কানাডায় ১ হাজার ৫৮২টি মুদ্রা পাচারের ঘটনা ঘটেছে। এই অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কানাডায় এসেছে। পাচারকারীদের বিস্তারিত তথ্য ইতোমধ্যে কানাডিয়ান সিকিউরিটিজ ইনটেলিজেন্স সার্ভিসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, শেয়ারবাজারের ব্রোকারেজ হাউস, আবাসন কোম্পানি এবং ক্যাসিনো থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই তালিকায় কোনো বাংলাদেশির নামও থাকতে পারে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, বিদেশে সম্পদ গড়ার দিক থেকে রাজনীতিবিদের চেয়ে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, গোপনে কানাডার টরোন্টোতে অবস্থিত বাংলাদেশিদের বিষয়ে খোঁজ নেয়া হয়েছে। ধারণা ছিল, সেখানে রাজনীতিবিদদের সংখ্যা বেশি হবে। কিন্তু যে তথ্য এসেছে, তাতে আমি অবাক হয়েছি। সংখ্যার দিক থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ি-ঘর সেখানে বেশি। তাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে। যদিও এটি সামগ্রিক তথ্য নয়। তিনি বলেন, আমার কাছে ২৮টি কেস এসেছে। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ হলেন ৪ জন। এছাড়া কিছু আছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। তবে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু কানাডা নয়, মালয়েশিয়ায়ও একই অবস্থা। সূত্র জানায়, দেশে-বিদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধ ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তথ্যের আদানপ্রদান করতে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে ১৫৯টি দেশ ওই গ্রুপের সদস্য। বাংলাদেশ এই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় এখন সব দেশ থেকে মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বা টাকা পাচারবিষয়ক যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।