পবিত্র হজ

58

বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ সংহত হোক
আজ (শনিবার) পবিত্র হজ। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাকা’-এই ধ্বনিতে আজ মুখরিত হবে আরাফাতের ময়দান। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান আরাফাতের ময়দানে থাকবেন। কেউ পাহাড়ের কাছে, কেউ সুবিধাজনক জায়গায় বসে ইবাদত করবেন। ‘হজ’ পালনের জন্য সারা বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ইতিমধ্যে সৌদি আরবের মিনায় পৌঁছেছেন। মিনায় অবস্থান করাও পবিত্র হজের অংশ। পবিত্র হজ ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আর্থিকভাবে সমর্থ ও শারীরিকভাবে সক্ষম পুরুষ ও নারীর জন্য হজ ফরজ। রাসূলুলস্নাহ (সা.) বলেছেন, আরাফাতই তো হজ। যে ব্যক্তি মুজদালিফায় যাপন করা রাতের ফজরের নামাজের আগে এখানে এসে পৌঁছবে, তার হজ পূর্ণ হয়ে গেল। আরাফাত ময়দানে জাবালে রহমত অবস্থিত। এই পর্বতের ওপরে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, এই পাহাড়ে হযরত আদম (আ.) ও হযরত হাওয়ার (আ.) দেখা হয়েছিল। এই পাহাড়ে একটি উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলেন। আরবি ‘হজ’ শব্দের অর্থ ও মর্ম খুবই ব্যাপক এবং বিস্তৃত। শব্দার্থের দিক দিয়ে হজ হলো, কোনো কাজের ইচ্ছা করা বা দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা। বৈয়াকরণ খলীলের ভাষায়, হজ অর্থ কোনো মহৎ ও বিরাট কাজের জন্য বারবার ইচ্ছা ও সংকল্প করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় হজ হলো, আলস্নাহর ঘরের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কতকগুলো বিশেষ ও নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে আলস্নাহর ঘরের জিয়ারতের সংকল্প করা। বলাই বাহুল্য, সুপ্রাচীন কাল থেকে এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এর সঙ্গে আদি মানব-মানবী হযরত আদম (আ.) ও মা হাওয়া (আ.), হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত ইসমাইল (আ.) ও মহানবীর (সা.) স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ নির্মিত হয় তা তো বাক্কায় (মক্কায়), তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। হজ সম্পাদনে হাজীদের সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত কিছু কাজ করতে হয়। এগুলো হলো খানায়ে কাবা তাওয়াফ করা, মাকামে ইব্রাহিমের পশ্চাতে নামাজ পড়া, সাফা ও মারওয়ায় সাঈ করা, মিনায় গমন করা, মুজদালিফায় অবস্থান করা, শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা, কোরবানি আদায় করে মাথার চুল ছেঁটে ন্যাড়া হওয়া, তাওয়াফে জিয়ারত আদায় করা এবং মিনা থেকে মক্কায় গিয়ে পবিত্র কাবা শরিফ সাতবার তাওয়াফ করা ইত্যাদি। এসব কর্মের মাধ্যমে হজের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে হজ করল কিন্তু আমার রওজা জিয়ারত করল না, সে আমার প্রতি জুলুম করল। তিনি আরও বলেছেন, যে আমার রওজা জিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত হয়ে গেল। মদিনায় অবস্থানকালে হাজিদের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো, মসজিদে নববীতে হাজিরা দেয়া এবং সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামাজের সওয়াব ৫০ হাজার রাকাত নামাজের সমান। হজের এসব ইবাদতের মূল্য কত অপরিসীম, সহজেই তা বোঝা যায়। রাসূলুলস্নাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ করে, আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না, তার পূর্ববর্তী গোনাগুলো মাফ করে দেয়া হয়। হজের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিক ছাড়াও আরও নানা দিক রয়েছে। হজ বিশ্ব মুসলিমের এক মিলনমেলা। সারাবিশ্বের মুসলমানরা একই পোশাক পরে, লাব্বাইক ধ্বনি উচ্চারণ করে, একই অবস্থানে অবস্থান করে মহান আলস্নাহর রেজামন্দি লাভের জন্য কাতরভাবে প্রার্থনা জানায়। তাদের দেহ-মনে থাকে ক্ষমা ও মুক্তিলাভের উদগ্র বাসনা। হজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নানা বর্ণ, গোত্র, ভাষার মানুষের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি ও সংহত করে। পরস্পরকে জানার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কোনো বিশ্ব সম্মেলনে সম্ভব নয়। হজ আলস্নাহপাকের ক্ষমা, করুণা ও নৈকট্য লাভের অছিলা হোক, বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য-সংহতি ও সৌভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখুক, আমরা একান্তভাবে সে কামনাই করি।