পবিত্র আশুরা

17

সর্বত্র সত্য ও ন্যায়ের জয় হোক
আজ পবিত্র আশুরা। আশুরা ইসলাম ধর্ম অনুসারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ইসলামের পরিভাষায় আশুরা বলতে মহররম মাসের ১০ তারিখকে বোঝায়। মহররম ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। বছরের প্রথম মাস হিসেবে মহররম যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আশুরা। সুন্নি মতানুযায়ী ইহুদিরা মুছার (আ.) বিজয়ের স্মরণে আশুরার সওম পালন করত। তবে শিয়া মতেএ ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তারা আশুরাকে কারবালার বিষাদময় ঘটনার স্মরণে পালন করে। আশুরা উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের মিছিল, মাতম ও শোকানুষ্ঠান আয়োজন করে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলমানরা। তথ্য মতে, আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। জনপ্রিয় ধারণাগুলোর মধ্যে, আশুরার দিনে নবী মুহাম্মদের দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলী নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন। আবার বলা হয়ে থাকে, এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিন নবী মুসার শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হয়। তবে কারবালার যুদ্ধের কারণে এ দিনটি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে আশুরা বহু উত্থান-পতন, ভাঙা-গড়া ও ধ্বংস-সৃষ্টির স্মৃতি ধারণ করে আসছে। ইসলামের ইতিহাসে মহররম মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিভিন্ন কারণে। এই মাসের ১০ তারিখে আলস্নাহতায়ালা আদি পিতা আদমের (আ.) তওবা কবুল করেছেন। এই দিনের আরও নানা ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়। আশুরার ঘটনা পরম্পরায় ৬১ হিজরিতে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে মানব ইতিহাসের নির্মমতম, হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী ঘটনা সংঘটিত হয়। এতে ঘটনাবহুল আশুরার সঙ্গে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনার সংযোগ হয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) প্রিয় দৌহিত্র ও হজরত আলীর (রা.) পুত্র হোসেন (রা.) এই দিন দামেস্কের অধিপতি ইয়াজিদের হাতে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে শাহাদাত বরণ করেন। এছাড়া আহলে বাইত ও হোসেনের (রা.) অনুসারীদের মধ্যে মোট ৭২ জন শহীদ হন। অন্যায়, অসত্য ও শোষণের বিরুদ্ধে কারবালার প্রান্তরে এই বিয়োগান্ত ঘটনাকে মুসলিম বিশ্ব প্রতিবছর দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করে। নিজেদের ইমানি শক্তিকে স্রষ্টার পরম সান্নিধ্য লাভের জন্য উজ্জীবিত করে তোলে। কারবালার প্রান্তরে হোসেন (রা.) নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। কারবালার যুদ্ধ সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এই যুদ্ধে ৭২ জন নিহত হন যাদের সবাই পানি বঞ্চনার শিকার হন। প্রাক-ইসলামী যুগেও আশুরার ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। সময়ের ব্যবধানে আজ আশুরা চেতনার জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় নিয়ে টিকে আছে। কোথাও একে স্মরণ করা হচ্ছে শোকের স্মারক হিসেবে, কোথাও আনন্দের উপাদান হিসেবে। আবার কোথাও প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে। মুসার (আ.) অনুসারী ইহুদিরা আলস্নাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আশুরার দিনে উপবাস করে। শিয়া সম্প্রদায় তাজিয়া, মাতম, মর্সিয়া ও মিছিলের মাধ্যমে এই দিনে শোক প্রকাশ করে। আশুরা উপলক্ষে ইসলাম ধর্মে দুটি নফল রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। আশুরা ও কারবালার মূল চেতনা ক্ষমতার লোভ, চক্রান্ত ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। এটি সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতিতেও খুবই প্রাসঙ্গিক। সর্বোপরি বলতে চাই, হিজরি ৬১ সালের পুণ্যময় দিনে সংগঠিত এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে হোসেনি আদর্শ বুকে ধারণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা পালন করা ও বিশ্বময় ইসলামের বিজয় কেতন ওড়ানোর মানসে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া রক্তাক্ত কারবালার অনুপম শিক্ষা। সব অন্যায়, শোষণ ও ষড়যন্ত্র থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে কারবালার ত্যাগের মহিমায় সবার অন্তর আলোকিত ও শুদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ আমরা মনে করি, সর্বত্রই প্রয়োজন কারবালার সেই আদর্শের প্রতিষ্ঠা এবং চেতনার জাগরণ। সর্বত্র সত্য ও ন্যায়ের জয় হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।