নেই পদোন্নতি, বাড়ছে না বেতন

44

কঠিন সংকটে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তারা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে সরাসরি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে চাকরিতে প্রবেশ করা কর্মকর্তারা বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতি নিয়ে নানামুখী সংকটে আছেন। অনেকে ১৫-২০ বছর চাকরি করেও পদোন্নতির দেখা পাচ্ছেন না। অঘোষিতভাবে এক রকম ব্লক পদে চাকরি করে জীবন পার করতে হচ্ছে। উপরন্তু, বিদ্যমান বেতন স্কেলে তাদের এন্টি পদের বেতন গ্রেডে চরম বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে ৯ম ও ৮ম গ্রেডের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির ব্যবধান মাত্র ১ হাজার টাকা। তাছাড়া যারা সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তারা ১৫-১৬ বছর চাকরি করেও প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হতে পারছেন না। মিলছে না পদোন্নতি। আবার দীর্ঘ অপেক্ষার পর কেউ কেউ পদোন্নতি পেলেও উল্টো তার বেতন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, প্রথম শ্রেণির বেতন গ্রেড শুরু হয় ৯ম গ্রেড থেকে। মূলত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির যে সোপান তৈরি করা হয়েছে, সেটি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ক্ষেত্রে রাখা হয়নি। ফলে বেতন গ্রেডের মধ্যে একেবারে খারাপ অবস্থায় আটকে আছেন ৯ম ও ১০ম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া মেধাবী কর্মকর্তারা। যারা হয়তো কোটা ভাগাভাগিসহ নানা কারণে ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পাননি, কিন্তু যোগ্যতা ও মেধার বিচারে তাদের পেছনে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।
জাতীয় বেতন স্কেলের ২০টি গ্রেড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০তম গ্রেডে অবস্থানকারী চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তৃতীয় শ্রেণির পদে পদোন্নতি পেলে তার বেতন গ্রেড এক লাফে চার ধাপ উপরে ১৬তম গ্রেডে পৌঁছে যায়। যদিও বেতন বৃদ্ধির ব্যবধান বেশি নয়। কেননা, বিদ্যমান পে-স্কেলে ২০তম গ্রেডে মূলত বেতনের শুরু ৮২৫০ টাকা হলেও ১৬তম গ্রেডে গিয়েও মূল বেতন ৯৩০০ টাকা। তবে চতুর্থ শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পদোন্নতি পেতে কিছু সময় লাগলেও তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে মাত্র ৫-৬ বছরের মধ্যে পদোন্নতি পাওয়া যায়। অন্তত সচিবালয়ে এমন সুযোগ রয়েছে। কোনো কর্মচারী তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেলে তার বেতন গ্রেড ৬ ধাপ পার হয়ে চলে যান একেবারে ১০ম গ্রেডে। এখানে অবশ্য বেতন স্কেল ১৬ হাজার টাকা থেকে শুরু। কিন্তু এরপর পদোন্নতি পেয়ে আর সহজে উপরে ওঠা সম্ভব হয় না। এদিকে ক্যাডার, নন-ক্যাডার নির্বিশেষ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের বেতন স্কেল শুরু হয় ৯ম গ্রেড থেকে। এখানে মূল বেতন শুরু হয় ২২ হাজার টাকা দিয়ে। তবে ক্যাডার কর্মকর্তারা ধাপে ধাপে পদোন্নতি পেয়ে উপরে উঠতে পারলেও নন-ক্যাডারদের সে সুযোগ নেই। যে কারণে এখানে আটকে আছেন হাজার হাজার ক্যাডারবহির্ভূত কর্মকর্তা। যত সমস্যা এখানেই। কিন্তু ভুক্তভোগীদের অনেকে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস পান না।
সচিবালয়ে ২০০৪ সাল থেকে পিএসসির মাধ্যমে দ্বিতীয় শ্রেণির এওপিও পদে সরাসরি নিয়োগ শুরু হয়। প্রথমদিকে সংখ্যা কম হলেও বর্তমানে তা বাড়ছে। যাদের বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। কোটার বাধাসহ নানা কারণে তারা ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পাননি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এদের সংখ্যা এখন প্রায় সাড়ে ৩শ’। চাকরিতে আসার আগে যারা প্রত্যেকে কমপক্ষে ২-৩টি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। অনেকে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও বাকিটা উতরাতে পারেননি। যে কারণে সচিবালয়ে তারা দ্বিতীয় শ্রেণির পদে চাকরি নিলেও তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেটদের কেউ কেউ এখন উপসচিব। কিংবা অন্য ক্যাডারেও ভালো পজিশনে আছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, তারা দীর্ঘ সময় ধরে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে পড়ে আছেন। এসব কর্মকর্তাদের অনেকে জানিয়েছেন, ‘আমরা যেসব স্যারদের অধীনে চাকরি করছি তারা প্রত্যেকে আমাদের এওপিও পদে পড়ে থাকা নিয়ে প্রায় আফসোস করেন। একইসঙ্গে তারা এও বলেন, তোমাদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে সহকারী সচিব করাসহ অন্তত উপসচিব পর্যন্ত পদোন্নতি দেয়া উচিত।’ তারা বলেন, ‘আমরা সরাসরি পিএসসির মাধ্যমে এওপিও হিসেবে নিয়োগ পেলেও সচিবালয়ে যারা এ পদে প্রমোটি তথা নিচের দিক থেকে পদোন্নতি পেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে এসেছেন, তাদের নাম জ্যেষ্ঠতা তালিকায় আমাদের উপরে। ফলে সহকারী সচিব পদে যেটুকু পদোন্নতির সুযোগ হয় সেখানে সহসা আমাদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ খুবই কম। এজন্য আমাদের যোগ্যতা ও মেধা নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন না থাকে তাহলে সহকারী সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এজন্য নিয়োগবিধি সংশোধনের বিকল্প নেই।’
একইভাবে যারা পিএসসির মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে বিভিন্ন দফতর সংস্থায় সহকারী পরিচালক কিংবা অন্য কোনো পদে যোগ দিয়েছেন তারাও আছেন বড় বিপাকে। বাস্তবতা এমন যে, পদোন্নতির তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে তারা কোনোভাবেই উপরে উঠতে পারছেন না। কোথাও পদোন্নতির সুযোগ আছে, কোথাও নেই। আবার কোথাও সুযোগ থাকলেও পদোন্নতি পেয়ে উপরের ধাপে যাওয়ার পথ অলিখিতভাবে বন্ধ। এমন ভুক্তভোগীদের অনেকে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন চাকরি করেও তারা আর্থিকভাবে তেমন কিছু অর্জন করতে পারছেন না। এর মধ্যে ২০০৯ সালের বেতন স্কেল মন্দের ভালো থাকলেও ২০১৫ সালের বেতন স্কেল বেশি ভালো করতে গিয়ে তাদের জন্য খুবই দুঃসংবাদ বয়ে এনেছে। সংকটের বাস্তব উদাহরণ দিতে গিয়ে একজন কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যমান পে-স্কেলে বলা হয়েছে, চাকরির একই পদে পদোন্নতি ব্যতীত ১০ (দশ) বছর পূর্তিতে ১ম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন। ১ম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির পর পরবর্তী ৬ (ছয়) বছর পদোন্নতি না হলে ৭ম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্ত হবেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডারের সহকারী পরিচালক পদে ৯ম গ্রেডে ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর যোগদান করি। বর্তমানে ৯ম গ্রেডে আমার মূল বেতন ৩২ হাজার ৫৪০ টাকা। চলমান পে স্কেল অনুযায়ী আমি ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর ১ম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্ত হব। উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির পূর্বের দিন ২১-১২-২০২১ তারিখে ৯ম গ্রেডে আমার মূল বেতন হবে ৩৪ হাজার ১৭০ টাকা। পরদিন ২২-১২-২০২১ তারিখে ১০ বছর পূর্তিতে ৮ম গ্রেডে আমার মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ৭২০ টাকা। অর্থাৎ ১০ বছর পর আমার উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তিতে বেতন বাড়বে মাত্র (৩৫৭২০-৩৪১৭০)= ১৫৫০ টাকা।’ তিনি জানান, ‘পূর্ববর্তী পে-স্কেল অর্থাৎ ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের ৭(৭) ধারা অনুযায়ী, ১ম শ্রেণির ৯ম গ্রেডে চাকরির ৪ বছর পূর্তিতে ১০০ শতাংশ সিলেকশন গ্রেডের বিধান ছিল। তাছাড়া ১ম শ্রেণির পদে ১০ ও ১৫ বছর চাকরি পূর্তিতে ১ম ও ২য় পরবর্তী উচ্চতর স্কেল (টাইম স্কেল) প্রাপ্তির বিধান ছিল। যদি ২০০৯ সালের পে-স্কেলের উচ্চতর গ্রেড (টাইম স্কেল) ও সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্তির সুবিধাটি ২০১৫ পে-স্কেলে বহাল থাকত তাহলে প্রথম শ্রেণির ৯ম গ্রেডে আমার চাকরির ৪ বছর পূর্ণ হতো ২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর। তখন আমার মূল বেতন হতো ৭ম গ্রেড টাকা ৩০ হাজার ৪৫০ টাকা। আবার চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে অর্থাৎ ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর ১ম উচ্চতর স্কেল (টাইম স্কেল) প্রাপ্তিতে আমার মূল বেতন হতো ৪৫ হাজার ৩৩০ টাকা। অথচ বর্তমানে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল না থাকার কারণে আমি (৪৫৩৩০-৩৪১৭০) অর্থাৎ ১১ হাজার ১৬০ টাকা শুধু মূল বেতন কম পাব। আমি ১১ হাজার ১৬০ টাকা মূল বেতনের বাড়ি ভাড়া ৫০ শতাংশ হারে ৫৫৮০ টাকা বাড়ি ভাড়াও কম পাব। সর্বমোট আমি ১১১৬০+৫৫৮০ = ১৬৭৪০ টাকা কম পাচ্ছি। এছাড়া আমি ২২-১২-২০২১ সালে পেনশনে গেলে মূল বেতন টাকা ১১১৬০-এর ৯০ শতাংশ = (১০০৪৪/২) = টাকা ৫০২২ী২৩০ (পেনশন ১ টাকা সমান ২৩০ টাকা) = ১১৫৫০৬০ (এগারো লাখ পঞ্চান্ন হাজার ষাট) টাকা কম পাব। যদি চাকরি শেষে স্বাভাবিক অবসরে যান সেখানে এ ব্যবধান আরও অনেক বেড়ে যাবে। তাই ২০০৯-এর পে-স্কেলের তুলনায় মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। তাছাড়া আমাদের যেহেতু কোনো পদোন্নতিরও সুযোগ নেই, তাই বেতন বাড়ারও প্রশ্ন আসে না। এ হল প্রথম শ্রেণিতে চাকরি করার আড়ালে বেতন ও পদোন্নতির বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র।’ ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা যুগান্তরকে আরও বলেন, ক্যাডার সার্ভিসে যাদের পদোন্নতির সুযোগ আছে, তারা পদোন্নতি পাচ্ছেন। তাদের বেতনের স্কেলও পরিবর্তন হচ্ছে।
প্রশাসন ক্যাডারে পদ না থাকলেও পদোন্নতি দেয়া হয়। তাদের বেতন এমনিতেই বাড়ছে এবং গ্রেডেরও পরিবর্তন হচ্ছে। ইদানীং আরও একটি ক্যাডারেও সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টির বিপরীতে পদোন্নতি হচ্ছে। অর্থাৎ পদোন্নতি দিয়ে নিয়মিত পদে পদায়ন না করে সংযুক্তি দিয়ে রাখা হচ্ছে। তারা বলেন, ‘প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে যারা চাকরিতে যোগদান করে সারা জীবনে পদোন্নতি পান না, তাদের ক্ষেত্রে এ বেতন বৈষম্য ১০-২০ গ্রেডের কর্মচারীর মতোই। তাই আমরা যারা ১ম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে কর্মরত আছি তারাও ১০-২০ গ্রেডের মতো সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল না থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’ তারা জানান, বর্তমান পে-স্কেলে ৯ম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার ও ৮ম গ্রেডের মূল বেতন ২৩ হাজার টাকা। ১ম শ্রেণির ৯ম গ্রেডে চাকরিতে ১০ বছর পূর্তিতে এভাবে ১ হাজার টাকা বেতন বৃদ্ধির স্কেলে যাওয়ার বিধান(!), যা হাস্যকর ও অমানবিক তো বটেই। এ বাস্তব সংকট নিরসনে তারা নীতিনির্ধারকদের কাছে ন্যায়সঙ্গত সমাধান প্রত্যাশা করেছেন।