নির্বাচন কমিশন গঠনে দরকার সব দলের মতৈক্য : খালেদা রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে আশাবাদী বিএনপি

302

image_1755_269370সমীকরণ ডেস্ক: বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সংলাপে সংকট নিরসনে নির্বাচনকালীন স্থায়ী সরকারব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনে ১৩ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জবাবে বিএনপির প্রস্তাব ইসি গঠনে সহায়ক হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।রোববার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের জন্য বঙ্গভবনের উদ্দেশ্যে বিকাল ৩টায় গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’ থেকে রওনা হন খালেদা জিয়া। বিকাল ৪টা ৩৭ মিনিটে দলের নেতাদের নিয়ে বঙ্গভবনে পৌঁছান তিনি। বঙ্গভবনে তাকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব ওয়াহিদুল ইসলাম খান। এরপর বঙ্গভবনের দরবার হলে এসেই রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কুশল জানতে চান। উত্তরে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি ‘মোটামুটি’ আছেন। রাষ্ট্রপতি হামিদ এ সময় তার স্পিকার থাকার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা খালেদাকে বলেন, ‘আগে সংসদে থাকতে তো দেখা হত। এখন তো আমি দূরে থাকি।’
পরে দরবার হলে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে আলোচনায় বসে বিএনপির প্রতিনিধি দল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এই সংলাপে অংশ নেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মাহবুবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকের জন?্য বঙ্গভবনে বিএনপির পাঠানো প্রতিনিধি দলের তালিকায় তরিকুল ইসলাম ও মির্জা আব্বাসের নামও ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে তরিকুল এবং সিঙ্গাপুরে থাকায় মির্জা আব্বাস সংলাপে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য শুরুতে রাষ্ট্রপতি তার আমন্ত্রণে সাড়া দেয়ায় বিএনপির প্রতিনিধি দলকে ধন্যবাদ জানান। এ সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই মুখ্য। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও সার্চ কমিটি গঠনের ব্যাপারে বিএনপি যে সমস্ত প্রস্তাব পেশ করেছে সেগুলো সহায়ক হবে। জয়নাল আবেদীন বলেন, রাষ্ট্রপতি সংলাপে বিএনপি প্রতিনিধি দলের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের মতামত পরবর্তী নির্বাচন কমিশন গঠনে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। যে কোনো বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় সমাধানের বহুমুখী পথের সন্ধান দেয়।’ প্রেস সচিব বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন গঠনে আলোচনার জন্য তার দলকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন ও সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরেন। এছাড়া গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণে তাদের প্রস্তাবও তুলে ধরেন তিনি। জয়নাল আবেদীন বলেন, বিএনপি রাষ্ট্রপতির উদ্যোগের সফলতা কামনা করে এবং এ ব্যাপারে তাদের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে বলে জানান।
এদিকে ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় নয়া পল্টন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি খুশি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক আশাবাদী। বৈঠকে বাছাই কমিটি গঠনের সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। বাছাই কমিটির বিষয়ে খালেদা জিয়া তার সুনির্দিষ্ট মতামত রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করেছেন। বিএনপি আশা করে, দেশের যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটা ফলোপ্রসূ ভূমিকা পালন করবে এবং এই আলোচনার প্রক্রিয়াটা অব্যাহত থাকবে।
রাষ্ট্রপতির উদ্যোগের প্রশংসা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রাষ্ট্রপতি একজন আপাদমস্তক রাজনৈতিক নেতা, তিনি দীর্ঘকাল ধরে দেশের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন এবং সর্বজন শ্রদ্বেয় একজন মানুষ। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে বিএনপি আশা করে এই সংকট নিরসনে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন।
বাছাই কমিটির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে কিনা প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দলের চেয়ারপারসন সুনির্দিষ্টভাবে তার মতামত রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ও উষ্ণ আমেজে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি তার স্বভাবসুলভ আচরণ ও আন্তরিকতা দিয়ে খালেদা জিয়া ও সদস্যদের স্বাগত জানিয়েছেন। অত্যন্ত হৃদতাপূর্ণ পরিবেশে এই আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনায় দেশনেত্রী জাতির উদ্দেশ্যে একমাস আগে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেই প্রস্তাবগুলো তার কাছে সংকিক্ষপ্তকারে তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দেশনেত্রীর প্রস্তাবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সব রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করা। যেহেতু এই কমিশন গঠনে কোনো আইন এখনো তৈরি হয়নি, এখন আর বিকল্প কোনো পথ নেই। সেজন্য রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন গঠন করার উদ্যোগ রাষ্ট্রপতির নেয়া প্রয়োজন।
নির্বাচন কমিশন গঠন ও শক্তিশালীকরণে প্রস্তাবাবলী দেয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রপতি ধন্যবাদ জানিয়েছেন উল্লেখ করে ফখরুল বলেন, দেশনেত্রী গঠনমূলকভাবে সুন্দর কতগুলো প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে যেটা ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন গঠন ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে রাষ্ট্রপতি মনে করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি এই অভিমতও প্রকাশ করেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আলোচনা ও সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। এই সমস্যার সমাধানগুলো আলোচনার মাধ্যমে হতে হবে বলে রাষ্ট্রপতি মনে করেন।
নির্বাচন কমিশন গঠনে খালেদা জিয়ার দেয়া প্রস্তাবাবলী বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাছাই কমিটি গঠনের পদ্ধতিগত বিষয়গুলো রাষ্ট্রপতি পরীক্ষা করবেন বলে জানিয়েছেন। যেহেতু প্রথম বিএনপির সঙ্গে কথা বললেন। রাষ্ট্রপতি প্রথমেই উল্লেখ করেছেন যেহেতু আপনারাই একমাত্র আমাকে এই বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, সেজন্যই আপনারাদের আমি প্রথম আমন্ত্রণ জানিয়েছি, আপনাদের মতামতকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনার করার জন্য আমি নিয়েছি।’ মির্জা আলমগীর বলেন, রাষ্ট্রপতি মনে করেন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ, সাহসী ও যোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা জাতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেজন্য সকল রাজনৈতিক দলের সমর্থন তিনি আশা করেন এবং এ বিষয়ে সবাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে- এটাও রাষ্ট্রপতি আশা করেন।
আলোচনার বিষয়বন্তু তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি রাষ্ট্রপতি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মধ্যেই তিনি তার পদ্ধতিগত বিষয়টা নির্ধারণ করবেন এবং এরপরে তিনি আবার রাজনৈতিক দলগুলো সঙ্গে আরেকটা আলোচনা সুযোগ সৃষ্টি হবে, পদ্ধতিগত বিষয়টা পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবেন। আমরা আশা করছি, আগামী মাসের মধ্যে তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটা শেষ করবেন। রাষ্ট্রপতিরও আগামী মাসে মধ্যে এটা শেষ করতে চান।’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনসহ রাজনৈতিক সংকট নিরসনে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের স্থায়ী ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে দলের প্রস্তাবলীর সারসংক্ষেপ লিখিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের অধীনে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আগামী দিনে ব্যাপক জাতীয়ভিত্তিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা প্রণয়ন প্রয়োজন।’
গত দুটি জাতীয় নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণকে আস্থাহীন ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এ পরিস্থিতি আর চলতে পারে না। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন করা গেলে তা একটি সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
রাষ্ট্রপতিকে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা মনে করি আমাদের প্রস্তাবগুলো যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আশা করি ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে অধিকতর আলোচনার জন্য আপনি আমাদের আবারও আমন্ত্রণ জানাবেন। জাতির অভিভাবক হিসেবে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে আপনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সে উদ্যোগ সফল হবে।’
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির তরফ থেকে সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশনের জন্য পৃথকভাবে ১০ জনের নামের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএনপির প্রস্তাবনার সঙ্গে মিল রেখে এসব নামগুলোও রাষ্ট্রপতিকে দেয় বিএনপি। এ সময় খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে বলেন, প্রস্তাবিত নামগুলো নিয়ে আপনি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেও আলোচনা করতে পারেন। যদি মিলে যায় তাহলে সেসব নামগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান বিএনপি প্রধান। বিএনপির তরফ থেকে অবশ্য এসব নাম প্রকাশ করা হয়নি।
বৈঠকে অংশ নেয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা জানান, রাষ্ট্রপতি আলাপচারিতায় আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সংকটের সমাধান হবে।’ প্রসঙ্গত, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসি আগামী ফেব্রুয়ারিতে বিদায় নিচ্ছে। গতবারের মতোই সার্চ কমিটি গঠন করে নতুন ইসি গঠন করতেই রাজনৈতিকদলগুলোর সঙ্গে এই সংলাপ শুরু করলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।