নিরাপত্তা পরিষদে নিষ্ফল আলোচনা

165

সমীকরণ ডেস্ক: সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব ছাড়াই শেষ হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা। বৈঠকে রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। তিনি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতাকে মানবিক দুঃস্বপ্ন (হিউম্যানিটারিয়ান নাইটমেয়ার) হিসেবে অভিহিত করেছেন। সতর্কবার্তা দিয়েছেন এই অভিযান বন্ধ না হলে সহিংসতা আরো ছড়িয়ে পড়বে। আরো বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হবে। বাংলাদেশের স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত একটার দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার সংকট নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ওদিকে, মিয়ানমারের কাছে সব দেশকে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে জাতি নিধনে যেসব নেতা, বিশেষ করে সামরিক নেতা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি নিরাপত্তা পরিষদের ওই অধিবেশনে এসব দাবি উত্থাপন করেন। এই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের রাখাইনে মুসলিম  রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতাকে জাতি নিধন বলে অভিহিত করলো। পাশাপাশি শাস্তি দাবি করলো সেনা কর্মকর্তাদের। নিকি হ্যালি বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নৃশংসতা চালাচ্ছে। তারা জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নিধন অভিযান চালাচ্ছে। এ অবস্থায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাতে আমাদের ভীত হওয়া চলবে না। তবে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ও ব্যাপক সংখ্যক মানুষের বাংলাদেশে চলে যাওয়ার কারণে মিয়ানমার সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেয়া হলে তাতে মিয়ানমার ও এর আশেপাশের পরিস্থিতিকে আরো উত্তেজিত করবে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেজিয়া। এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক উপায় ও আলোচনার কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। বলেন, আলোচনা হতে হবে মিয়ানমারের সব জাতি ও ধর্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে। একই সঙ্গে তিনি সব পক্ষের তরফ থেকে সহিংসতা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন। এ সময় তিনি মিয়ানমার সরকারের সুরে সুর মিলান। বলেন, রাশিয়া যেসব তথ্য পাচ্ছে তাতে  দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলো থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করছে। তিনি মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘সন্ত্রাসীরাই’ গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
ওদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনের উপ-রাষ্ট্রদূত উয়াউ হাইতাও মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সহিংসতার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, যেসব রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে চলে গিয়েছেন তাদের সমস্যা দ্রুততম সময়ে সমাধান হওয়ার মতো নয়। এ সময় তিনি মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে রাখাইন সহিংসতায় নিজেদের দায় বেমালুম এড়িয়ে গেছেন মিয়ানমারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইউ থাউং তুন। তিনি আরো বলেন, জাতিগত নিধন হয়নি মিয়ানমারে। কোনো গণহত্যাও চালানো হয়নি। তিনি দাবি করেন বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী রোহিঙ্গা মুসলিম উগ্রপন্থিরা। তাদের সহিংসতার জন্যই মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য হয়েছে।
ওদিকে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, মিয়ানমার সরকার অভিযান বন্ধের কথা বললেও এখনো রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হয়নি। এর ফলে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন কমপক্ষে ৫ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে বিশে^র সবচেয়ে নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৯ লাখ সদস্য এখন বাংলাদেশে। তিনি এই পরিস্থিতিকে সমর্থন অযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেন। আবারো জাতিসংঘের কাছে আহ্বান জানান মিয়ানমারের ভেতরে একটি সেফ জোন সৃষ্টি করতে।
জাতিসংঘের একটি প্যানেল যে এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিধন করা হয়েছে বা হচ্ছে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু মিয়ানমার সরকার সেই অনুমতি দেয়নি। এরই প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এমন ঝাঁঝালো প্রতিক্রিয়া এলো। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী কমপক্ষে ৫ লাখ এক হাজার  রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে নির্বিচারে চলছে গণধর্ষণ, গণহত্যা। গ্রামের পর গ্রাম জ¦ালিয়ে দেয়া হচ্ছে। ওদিকে বৃহস্পতিবার শতাধিক রোহিঙ্গা বোঝাই করে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করার পর একটি নৌকা বঙ্গোপসাগরে ডুবে  গেছে। এতে কমপক্ষে ১৫ জন মারা  গেছে। এর মধ্যে ৯ শিশু রয়েছে। এ তথ্য দিয়েছে অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এপি, অনলাইন স্কাই নিউজ।
নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় গতকাল বিকাল তিনটায় (বাংলাদেশ সময় রাত একটায়) এ বিতর্ক শুরু হয়। এতে অ্যান্তনিও গুতেরাঁ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে যে সহিংসতা চলছে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ওপর তা রাখাইনের মধ্যাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওই এলাকায় এখন আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছেন। যৌন সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, মিশর, সেনেগাল ও কাজাখস্তানের আহ্বানে শুরু হয় নিরাপত্তা পরিষদের এ বৈঠক। এতে বক্তব্যে মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ বলেন, অবিলম্বে আক্রান্ত এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার সুযোগ দিতে হবে।
এদিনের আলোচনায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালির বক্তব্য ছিল এ যাবৎ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ। তিনি বলেন, ‘এক মাসের বেশি সময় ধরে বার্মা থেকে যেসব ছবি পুরো বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে তা যেন কাউকে দেখতে না হয়। আমরা যেসব কর্মকান্ডের ছবি দেখেছি সেগুলো যেন কাউকে সহ্য করতে না হয়।’ প্রাণ নিয়ে পালানো নারী-শিশুদের দুর্দশা, গ্রামের পর গ্রাম অগ্নিসংযোগ, রাখাইনে হত্যাযজ্ঞের নানা বর্ণনার রিপোর্ট, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তৎপরতা, মানবিক সহায়তার কথা উলেখ করেন হ্যালি।
সরেজমিন পরিস্থিতি দেখতে আবুল মাসুদ মোমেন নিরাপত্তা কাউন্সিলকে বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানান। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কূটনীতিকরা আরো আলোচনার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। এর অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিষদে আমন্ত্রণ জানানো হবে সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে। তিনি রাখাইনে তার তদন্তের অভিজ্ঞতা জানাবেন নিরাপত্তা কাউন্সিলকে। সবমিলিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে নিষ্ফল আলোচনায় ক্ষুব্ধ বিশ্ব।