নিরানন্দ অপরিচিত এক ঈদ পালন করলো চুয়াডাঙ্গাবাসী

158

এসএম শাফায়েত:
দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর গতকাল সোমবার উদযাপিত হয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। তবে এবার ঈদের সেই চিরচেনা আনন্দের রূপে ঘাটতি দেখা যায়নি। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট এবং অনিশ্চয়তায় অপরিচিত এক ঈদ উদযাপন করেছে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহসহ গোটা দেশবাসী। করোনার কারণে এবারের ঈদের আনন্দ ঘাটতি ছিল চরম। বলা যায় এ এক নিরানন্দ ঈদ উৎসব।

মানুষের আত্মশুদ্ধির একটি বলিষ্ঠ হাতিয়ার সিয়াম পালন বা রোজা। দীর্ঘ একমাস রোজা রাখার পর ধনী-গরিবের ব্যবধান ভুলে সার্বজনীন ঈদ উৎসবে মিলিত হয় সবাই। ঈদের দিন সকালে নামাজের পর একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করা, বড়দের সালাম করে সালামি নেওয়া, প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করা, ঘুরে বেড়ানো এগুলোই হচ্ছে ঈদের আনন্দ। তবে এবারে ঈদের সেইসব দৃশ্য দেখা যায়নি।

করোনা ভাইরাসের ঝুঁকির ফলে এবারের ঈদ সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। ফলে ঈদে চিরাচরিত সেই আনন্দের আবহ নেই। অনেকেই বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজন, বাবা-মার কাছ থেকে দূরে থেকে ঈদ উদযাপন করছেন। ঈদের সার্বজনীন চরিত্র হারানোর এ অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে নতুন। ভয় অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে ঈদের আনন্দ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

তবে বরাবরের চেয়ে উল্টো ছিল চুয়াডাঙ্গার কেন্দ্রীয় ঈদগাহসব জেলার বিভিন্ন এলাকার ঈদগাহ ময়দান। ঈদগাহ মাঠ কিংবা ময়দানে ছিল না নামাজের কোনো আয়োজন। মুসল্লিদের আনাগোনা না থাকায় ঈদগাহ ময়দানগুলো ছিল নিষ্প্রাণ। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদে মসজিদে পৃথক জামাতে ঈদের নামাজে অংশ নিয়েছে মুসুল্লিরা।

জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশের ন্যায় চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকার মসজিদে মসজিদে ইদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাতে বৃদ্ধ ও শিশুদের উপস্থিতি অন্য বছরের ঈদ জামাতের মতো ছিল না বললেই চলে। ছিল না নামাজ শেষে অতি পরিচিত কোলাকুলির দৃশ্য। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এবার ঈদের জামাত আদায় করা হয় মসজিদে এবং কোথাও কোথাও একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ আদায়ের আগে মুসল্লিরা নিজেদের জায়নামাজ সাথে নিয়ে আসেন পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে জীবাণুমুক্ত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। এরপর তারা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সারিবদ্ধ হয়ে বসেন। খুতবা শোনেন এবং নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে করোনা থেকে আল্লাহর কাছে মুক্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে মুসল্লিরা দ্রুত মসজিদ ত্যাগ করেন। এ সময় চিরপরিচিত কোলাকুলির দৃশ্য চোখে পড়েনি। যেসব মসজিদে একাধিক জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোতে প্রথম জামাতের পর মসজিদে দ্বিতীয় জামাতের জন্য জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়।

তবে এরমধ্যে কিছুটা আনন্দের খোরাক থাকলেও কিছু খবর ব্যথিত করেছে গোটা জেলাকে। ঈদের আগের দিন অর্থ্যাৎ চাঁদ রাতে দামুড়হুদা উপজেলার কুতুবপুর মুন্সিপুর সীমান্তে সাইফুল ইসলাম নামে এক এনজিও কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। চাঁদ রাতে মাংস কিনতে বের হয়েছিলেন তিনি।  আর এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন থেকে শুরু মরদেহ দাফনের সম্পূর্ণ কার্যক্রমে দামুড়হুদা থানা পুলিশ ও নিহতের পরিবারের ঈদ উৎসব ফিকে হয়ে গেছে।

খবর পাওয়া যায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামে ঈদের জামাত মসজিদে হবে না ঈদগাহে এ নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। রোববার ঈদের আগের দিনগত রাতে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামে মাঝেরপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ফুলবাড়িয়া মাঝেরপাড়া জামে মসজিদের ঈমাম ছানোয়ার হোসেনকে (৫৫) রক্তাক্ত জখম করা হয়েছে। আহত ছানোয়ার হোসেন ফুলবাড়িয়া মাঝেরপাড়ার মৃত আলামিন জমাদ্দারের ছেলে। এ ঘটনায় পুলিশ রাতেই অভিযুক্ত ইলিয়াছ হোসেনকে আটক করলেও পরদিন তাকে মুচলেকায় মুক্তি দেয়া হয়।

এদিকে, ঈদের দিন দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক যুবকের মৃত্যুর খবরটিও নাড়া দিয়েছে সবার মনে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে রাশেদুজ্জামান টোকন (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়। আহত হয় আরও দুজন। ঈদের দিন সোমবার দুপুরে  উপজেলার বন্দর রামনগরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, রাশেদুজ্জামান টোকন সাহেবপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে।  ঈদের দিন দুপুরে টোকন দুই চাচাতো ভাই রিফাত ও শামীমকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হন। ফুফার বাড়ি বন্দর রামনগর ঘুরে তারা মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি  ফিরছিলেন। বন্দর রামনগর মোড়ে পৌঁছুলে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি মোটরসাইকেলের সাথে  মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনায় আহত তিনজনকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাশেদুজ্জামান টোকনকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত রিফাত ও শামীমকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

এরইমধ্যে করোনাভাইরাস জেকে বসতে শুরু করলো। কিছুদিন ভালো অবস্থায় থেকে আবারও তার প্রভাব বিস্তার শুরু হয়েছে। আর ঠিক ঈদের আগের দিন খবর আসে জীবননগরের দুইজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের ধোপাখালী গ্রামের (মাঠপাড়া) আক্তার হোসেনের ছেলে মোঃ আশিকুর রহমান (২৫) এবং বাঁকা ইউনিয়নের বাঁকা নওদাপাড়ার শুকুর আলীর স্ত্রী আনোয়ারা খাতুনের (৩৫) করোনা টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসার খবর জীবননগর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ জুলিয়েট পারউইন স্নিগ্ধ্যার মাধ্যমে জানতে পেরে করোনা আক্রান্ত রোগী দুটির বাড়ি লকডাউন করে দেয়া হয়। পুলিশ জানায়, উভয় রোগীই নিজ নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে আছে। তারা দুজনই ঢাকা থেকে কিছুদিন আগে নিজ নিজ গ্রামে ফেরত আসার পর তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেছিলো জীবননগর থানা পুলিশ।