ধোঁয়াশায় ঘেরা সংলাপ

148

আলোচনা ভালো হয়েছে : ড. কামাল * সন্তুষ্ট নই : ফখরুল * আলোচনার পথ খোলা আছে : কাদের * বিরোধীদের সভা-সমাবেশে সম্মতি * বিদেশি পর্যবেক্ষকে আপত্তি নেই * খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয় আদালতের
ডেস্ক রিপোর্ট: সন্ধ্যা সাতটা। গণভবনে চোখ বাংলাদেশের। একই টেবিলে আওয়ামী লীগ ও বিরোধী জোটের নেতারা। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্য। সাড়ে তিন ঘন্টা খোলামেলা আলোচনা। বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য। শুরুতে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন মনে করিয়ে দেন অতীতের কথা। বলেন, ৭৩ সালে গণপরিষদ ভেঙেই নির্বাচন হয়েছিলো। সাত দফা উপস্থাপন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন দুই দফায়। আলোচনায় আসে প্রায় সব ইস্যুই। তবে নির্বাচনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে দেয়া, খালেদা জিয়ার মুক্তির মতো বড় তিনটি ইস্যুতে আলোচনায় কোন অগ্রগতি হয়নি। অগ্রগতি বলতে সভা-সমাবেশে বাধা না দেয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। সংলাপ আরো হবে কি-না তা খোলাসা হয়নি। সরকারের তরফে বলা হয়েছে, ঐক্যফ্রন্ট চাইলে আরো আলোচনা হবে। তবে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, সংলাপের জন্য ঐক্যফ্রন্টকে ডাকা হবে না।
সংলাপ শেষে আলাদা প্রতিক্রিয়া দেয় দুই পক্ষ। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, সংলাপে বিশেষ কোন সমাধান মিলেনি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংলাপে সন্তুষ্ট নন বলে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংবিধানের মধ্যেই আলোচনা হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানায়, সন্ধ্যায় সাতটায় শুরু হওয়া সংলাপের প্রারম্ভে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সূচনা বক্তব্য দেন। এরপর ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কথা বলেন। বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সবাই আলোচনায় অংশ নেন। নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচনের তফসিল, খালেদা জিয়ার মামলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা ও সভা সমাবেশের অনুমতি দেয়ার বিষয় আলোচনায় আসে।

দুই পক্ষের নেতাদের বক্তব্য শেষে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার সমাপনী বক্তব্যে ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে এই নিশ্চয়তা তিনি দিচ্ছেন। বৈঠক সূত্র জানায়, সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি তোলা হলে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? খালেদা জিয়ার মামলার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী এটিকে আইনী বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি এটাও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেনি। মামলা করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নির্বাচনের তফসিলের বিষয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটি নির্বাচন কমিশনের বিষয়। রাজবন্দির মুক্তি ও রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করেন ঐক্যফ্রন্টের একজন নেতা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন রাজবন্দি কারা? দেশে কোন রাজবন্দি আছে কিনা? তিনি বলেন, কোন মামলা রাজনৈতিক তার তালিকা দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, সংবিধানে এ ধরনের সরকারের কোন বিধান নেই।
সংলাপে অংশ নেয়া মাহমুদুর রহমান মান্না আলোচনার বিষয়ে জানিয়েছেন, সভা সমাবেশের বিষয়ে এক ধরণের প্রতিশ্রুতি ছাড়া তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। উনারা আমাদের বক্তব্য শুনেছেন। নির্বাচনে যাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। বলেছেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। সংলাপে অংশ নেয়া আরেকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংলাপে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অগ্রগতি খুব একটা হয়নি। এখন আমরা আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো। আলোচনায় অংশ নেয়া আরেক নেতা বলেন, আলোচনায় সরকারি দলের সুর ছিলো- পারলে আন্দোলন করে দাবি আদায় করেন।
এর আগে সংলাপের শুরুতে আওয়ামী লীগের সময়ে কেমন উন্নয়ন হয়েছে তার বিচারের ভার আপনাদের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সবাই মিলে মিশে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপের সূচনা বক্তব্যে এ কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। সংলাপের শুরুতে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আজকে এই অনুষ্ঠানে আপনার এসেছেন গণভবন ও জনগণের ভবনে। এই ভবনে আপনাদের স্বাগত জানাই। এই দেশটা আমাদের সবার। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমি এটা বিচারের ভার আপনাদের ওপর ছেড়ে দেব। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৯ বছর ১০ মাস হতে চলল, আমরা এই সময়ের মধ্যে দেশে কত উন্নয়ন করতে পেরেছি সেটা নিশ্চয়ই আপনারা বিবেচনা করে দেখবেন। এটুকু বলতে পারি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভালো আছে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটছে। দেশের জন্য আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছি। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে গণতন্ত্রের যাত্রা এবং উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আজকের দিনটি বিরাট অবদান রাখবে বলে মনে করি। তিনি বলেন, দিনবদলের যে সূচনা করেছিলাম সেই দিনবদল হচ্ছে। এটাকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন করতে হবে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা এ স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজকে সেই স্বাধীনতার সুফল যেন প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছতে পারে সেটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।
সংলাপে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের ২৩ জন এবং ঐক্যফ্রন্টের ২০ জন নেতা অংশ নেন। এর মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির নীতিনির্ধারণ ফোরাম স্থায়ী কমিটির ৬ সদস্য ছিলেন। তবে আমন্ত্রণ পেলেও বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সংলাপে যাননি। ২০০৬ সালে নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আলোচিত সংলাপের পর এই প্রথম দুই পক্ষের নেতারা এক টেবিলে বসলেন। ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ আহ্বানে আওয়ামী লীগের সাড়া দেয়ার পর থেকেই রাজনীতি ক্ষেত্রে এক ধরনের আশার আলো দেখা দিয়েছে। গতকালের বহুল প্রতীক্ষিত সংলাপ ঘিরে পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি ছিল গণভবনে। গণভবনে সংলাপে অংশ নেয়ার আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বেইলী রোডের বাসায় বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তারা গণভবনের উদ্দেশে রওনা দেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর ঐক্যফ্রন্টের নেতারা গণভবনে পৌঁছান। সন্ধ্যা ৭টায় দুই পক্ষের সংলাপ শুরু হয়। গণভবনের ব্যাংকুইট হলে দুই পক্ষের নেতারা সামনা সামনি বসে আলোচনা করেন। বৈঠকের শুরুতে নেতাদের আপ্যায়িত করা হয়।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংলাপের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর সফলতা নেই বললেই চলে। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৬ সালের ২২ জানুয়ারি, এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৪ সালের এপ্রিল ও ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর সংলাপের উদ্যোগ হলেও এর প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৪ সালে কমনওয়েলথের তৎকালীন মহাসচিব এনিয়াওকুর এমেকা ও তার বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ানের মধ্যস্থতায় সংলাপ হলেও ওই সময়ের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল। এছাড়া ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল তিন সপ্তাহব্যাপী ছয় দফা বৈঠক করলেও সমঝোতা হয়নি। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচন নিয়ে সংকট নিরসনে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সমঝোতা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে সরাসরি ফোন দিয়ে সংলাপের আমন্ত্রণ জানালে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন হয়।