ধানের লাভ-আসল সব মধ্যস্বত্বভোগীর পেটে

10

সমীকরণ প্রতিবেদন:
আমনের পর বোরো মৌসুমেও দেশে বাম্পার ফলন হয়েছে ধানের। ফলন দেখে খুশির আভা ফুটেছিল কৃষকের মুখে। তবে সেই খুশি মিলিয়ে গেছে দ্রুত। কারণ ফলন বাড়লেও দাম কম ধানের। স্থানভেদে ৪০০-৫০০ টাকায় ঘুরছে প্রতিমণ ধানের দাম। অথচ প্রতিমণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে ৭০০-৮০০ টাকা। গড়ে মণপ্রতি ৩০০ টাকা লোকসান হচ্ছে কৃষকের। জনবল সংকটে কোথাও কোথাও ফসল কাটার খরচই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের জন্য। দুই মণ ধানের দামেও একজন দিনমজুর মিলছে না কোথাও কোথাও। ফলে অনেক এলাকায় কৃষকরা জমিতেই ফেলে রাখছে ধান। গত দুই দিন দেশের বিভিন্ন এলকায় মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে মিলেছে এমন চিত্র।
এদিকে ধানের দাম কম হওয়ার পেছনে বিভিন্ন জায়গায় মজুদদার ও মিল মালিকদের কারসাজি দেখছে কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি দ্রুত সংস্কার করার দাবিও জানাচ্ছে তারা। বিশেষ করে চাল সংগ্রহের নামে মিলার-ডিলারদের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ করে দেওয়ার পদ্ধতি বাদ দিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সেটি না হলে সরকারের এ কার্যক্রম সফল হবে না। চলতি বোরো মৌসুমে এখনো সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ হয়নি মোটেই। বরং কৃষক তাদের অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছে নানাভাবে। মাঠপর্যায়ে খাদ্য কর্মকর্তারাও ধান সংগ্রহে অনেকটা নির্লিপ্ত বলে অভিযোগ আছে। কেউ কেউ বলছে, মাঠপর্যায়ের একশ্রেণির কর্মকর্তা ও মিলার বা মজুদদার অপেক্ষায় আছে আরেক দফা বৃষ্টির। তখন কৃষকরা মাঠের পাকা ধান নিয়ে আরো বিপাকে পড়লে ধানের দাম আরো কমে যাবে, আর মিলাররা কম দরে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে চাল বানিয়ে সরকারের কাছে বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ নেবে।
এসব বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আরিফুর রহমান অপু বলেন, ‘এখনো ধান সংগ্রহে গতি আসেনি। এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তাদের তাগিদ দিয়েছি তাঁরা যেন দ্রুত মাঠে নেমে পড়েন। এমনকি আমরাও মন্ত্রী মহোদয়কেসহ মাঠে নামব। কারণ আমরাও চাই কৃষক যেন বঞ্চিত না হয়। তাদের কাছ থেকেই আমরা সরাসরি ধান কিনতে চাই।’ মহাপরিচালক একপর্যায়ে বলেন, ‘সব ক্ষেত্রেই কিছু দুষ্ট লোকজন থাকে। এখানেও তেমন কিছু হতে পারে। মিলাররা নানা অজুহাতে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে চাল করে বিক্রির কারসাজি করার চেষ্টা করতে পারে। তবে আমরা এসব বিষয় কঠোরভাবে মনিটর করব।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগম বলেন, ‘বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের দেশে এটা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ হয়ে গেছে যে প্রকৃত কৃষকরা তাদের উৎপাদন মূল্য তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ অন্য সব পেশার মতো তাদেরও উপার্জনের মূল উৎস হচ্ছে এই ধান উৎপাদন। যেখানে তার উৎপাদন খরচ এবং সংসার চালানোর মতো অর্থ ওঠানোর জন্যই কৃষকের চাষাবাদ করার কথা, সেখানে এখন উৎপাদন খরচই ঠিকমতো উঠছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষির ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো হবে না।’
এই কৃষি অর্থনীবিদ বলেন, ‘সরকারের দিক থেকে কৃষকদের ভাগ্যের উন্নয়নে সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই, প্রচুর ভালো উদ্যোগও আমরা দেখছি। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কেন যেন কিছু গলদ থেকে যায়। যে গলদের ফাঁক দিয়ে সহজেই মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের ভাগের লাভ খেয়ে ফেলে আর বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। এ ক্ষেত্রে আমার মতামত হচ্ছে, যে করেই হোক সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচির সময় সরকারের লোকজন সরাসরি যাতে কৃষকের কাছে গিয়ে ধান কিনে আনে। মাঝে যেন ডিলার বা মিলারদের কোনো প্রবেশ না থাকে। এ ছাড়া দাম নির্ধারণের সময় যেন কৃষকদের প্রকৃত খরচ ও তাদের লাভের অংশটির কথা মাথায় রাখা হয়।’
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ এফপিএমসির সভায় চলতি বোরো মৌসুমে ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান-চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে এক লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান (চালের আকারে এক লাখ টন), ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল থাকবে। আর প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা, প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের দাম ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা খুবই ইতিবাচক। অর্থাৎ মণপ্রতি দাম হয় এক হাজার ৪০ টাকা। এটাকে কৃষকবান্ধব দর বলা গেলেও বাস্তবে এই দাম কৃষকের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সরকার মিলারদের মাধ্যমে বেশি দামে চাল কিনলেও মিলাররা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে। এককথায় সরকারি দামের অর্ধেকও পায় না কৃষক; ওই টাকা যায় মধ্যস্বত্বভোগী মিলারদের কাছে। আর মিলাররা ধান শুকানোর মানের অজুহাত তুলে কৃষককে বঞ্চিত করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি লোকজনও ধান শুকানোর মান নিয়ে মিলারদের কারসাজির সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মীর নুরুল আলম বলেন, ‘গেল আমন মৌসুমে আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান অতিরিক্ত উত্পাদন হয়েছে। তার ওপর এবার বোরো মৌসুমেও গত বছরের তুলনায় ধান চাষাবাদ হয়েছে এক লাখ হেক্টর বেশি জমিতে। ফলনও বেশ ভালোই হয়েছে। বাম্পার হলেও ঠিক কী পরিমাণ বেশি হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ বোরো মৌসুম শেষ হতে আরো মাসখানেক সময় আছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। বাকিগুলো উঠে যাবে আগামী মাসের প্রথম ভাগ নাগাদ। কোথাও কোথাও বিলম্বিত চাষাবাদ ও ফলনের কারণে এমনটা হচ্ছে। আর এখন পর্যন্ত যা কাটা হয়েছে তাতেই আমরা বলতে পারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন হয়েছে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য তুলনামূলকভাবে কম হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিক ব্যয় বড় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের জন্য। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানতে পারছি, দুই মণ ধানের দামেও একজন মজুর মিলছে না। এর পেছনে কৃষি দিনমজুরের পেশা বদলের বিষয়টি অন্যতম সমস্যা হয়ে উঠেছে। শ্রমিকরা এখন জমিতে দিনমজুরি না করে অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে বা শহরে চলে যাচ্ছে। ফলে গ্রামে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।’
শ্রমিক সংকট কাটাতে করণীয় কী, জানতে চাইলে মীর নুরুল আলম বলেন, ‘আমরা এ জন্যই কয়েক বছর ধরে প্রযুক্তির দিকে নজর দিচ্ছি। এমন কিছু প্রযুক্তি দেশের কৃষি খাতে যুক্ত করার কাজ চলছে যা করতে পারলে জনবলের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে আবার কৃষকের খরচও অনেক কমে আসবে। ফলে ধানের দাম আর উত্পাদন খরচের ভারসাম্য বজায় থাকবে।’ অধ্যাপক ড. ইসমত আরা বেগমও বলেন, ‘আগে আমরা বড় সমস্যা হিসেবে দেখতাম সার-বীজ-কীটনাশকের বিষয়টিকে, কিন্তু এখন শ্রমিক সংকট নিয়েই আমাদের বেশি ভাবতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও সরকারকে আরো ভালোভাবে পরিকল্পনা করা উচিত।’