ধর্ষণ বন্ধে চাই সামাজিক আন্দোলন

98

মানুষ যখন থেকে আগুনের ব্যবহার শিখল, তখন থেকেই তার সভ্যতার মহাসড়কে পথচলা শুরু। আগুন অবিষ্কার ও তার ব্যবহার মানুষকে তার মস্তিষ্ক কাজে লাগাতে শিখিয়েছে। বলা চলে, ভালো-মন্দ বিচার-বিবেচনা করতে পারার দক্ষতা মানুষ ঠিক তখন থেকেই রপ্ত করেছে। মানুষ তার বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে জয় করেছে। পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। সভ্যতার উন্নতির চরম শিখরে উন্নত মানুষ নিজের বুদ্ধিমাত্তাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমাত্তাকেও কাজে লাগাচ্ছে। পশু শিকার সমাজ থেকে আজ আমরা গ্লোবাল ভিলেজ সমাজে বাস করছি। কিন্তু আদতে সভ্যসমাজে বসবাসরত মানুষ কি সভ্য হয়েছে? বিশেষ করে পুরুষেরা? পুরুষেরা কি তার স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারছে?
সম্প্রতি দেশব্যাপী ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিবেচনায় নিলে তা মনে হয় না। ঘটনার ভয়াবহতায় আঁতকে উঠতে হয়। কী হচ্ছে দেশে! ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন কোনো নারী লেখেন, কুকুরের কার্তিক মাস শেষ হয়, কিন্তু পুরুষের লালসার জিভের জল শেষ হয় না। তখন পুরুষ হিসেবে বড্ড বেশি অসহায় লাগে। ধর্ষক আর কুকুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য আসলেই কি করা যায়? উভয়ই কামতাড়িত হয়ে হিতাহিত শূন্য উন্মত্ত জানোয়ার। বস্তুত, পাশবিকতা ও মানবিকতা দুটিই মানুষের বৈশিষ্ট্য। পাশবিকতা জয় করে মানুষ যখন মানবিক হয়ে ওঠে, তখনই মানুষ নিজেকে প্রকৃত মানুষ বলে দাবি করতে পারে। মানবিক বোধশুন্য মানুষ আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, মানুষের মধ্যে মানবিকতা বোধ ভয়াবহ হারে লোপ পাচ্ছে।
দুটি ঘটনা বিবেচনায় নেওয়া যাক। প্রথমটি, চুয়াডাঙ্গায় চকলেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ছয় বছরের এক মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করেছেন ৫৫ বছরের নরপশু আবদুল মালেক। ঘটনার সময় মালেকের বাড়ি ছিল মহিলা ও মানুষশূন্য। অপরটি মাগুরায়। স্বামী বাড়ি না থাকায় এক মা তাঁর শিশুসন্তানকে নিয়ে নিজ বাসায় রাত্রি যাপন করছিলেন। এই সুযোগে একই গ্রামের দিপুল, মাজেদুল ও আশরাফুল নামধারী তিন নরপশু মহিলাটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন। প্রথম ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা ও সফলতা চোখে পড়ার মতো এবং তা প্রশংসার দাবি রাখে। দ্বিতীয় ঘটনায় মাগুরার শ্রীপুর থানার ওসি মহিলাটির মামলা না নিয়ে উল্টো নির্যাতিত মহিলার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে থানা থেকে বিদায় করেছেন। দুটি ঘটনায় প্রশাসনের দুই রকম ভূমিকা থাকলেও একটা বিষয়ে চরম মিল আছে। তা হলো পরিবেশ ও সুযোগ অনুকূলে আসা মাত্রই পুরুষগুলো পশুতে পরিণত হয়েছে।
ধর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার বহুবিধ কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, দেশে যৌন শিক্ষা মূলত সমবয়সী বন্ধু কেন্দ্রিক। এই উপমহাদেশে না পরিবার, না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও যৌনতা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ নেই। ফলে বন্ধুদের কাছে শোনা যৌনতার জ্ঞান এক ধরনের ফ্যান্টাসি তৈরি করছে। ফলে কোনো পিয়ার গ্রুপের একজন ধর্ষণ করার অভিজ্ঞতা লাভ করলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও তা করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। যৌনতা সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রয়োজন। এ কথা দেশের নীতিনির্ধারকেরা ভাবেন বলে মনে হয় না। ফলে দেশে শিক্ষিত থেকে অক্ষরজ্ঞানশূন্য সবাই একই পন্থায় যৌন শিক্ষা লাভ করছে। ফলাফল, সচিব থেকে শ্রমিক, কে নেই ধর্ষকের তালিকায়। আত্মীয়তা ও রক্তের বাঁধনও এ ক্ষেত্রে কাজে আসছে না। ধর্ষকের মিছিলে বাবা-শ্বশুর, চাচা-মামা-খালু, কাজিন সবাই শামিল হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষিতদের শিক্ষাও কোনো কাজে আসছে না। কলাবাগান থেকে ক্যান্টনমেন্ট, নিজ গৃহ থেকে চলন্ত গাড়ি কোথাও নারী আজ নিরাপদ নন।
ইন্টারনেট হলো যৌন শিক্ষার আরেক মাধ্যম। স্মার্ট ফোন সহজলোভ্য হওয়ায় তা মহামারি আকারে মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছে। বলাবাহুল্য, ইন্টারনেটে ভালো জিনিসের চেয়ে খারাপ জিনিসই বেশি শেখে মানুষ। এর সাথে যোগ হয়েছে দেশের গ্রাম থেকে শহরের অলিগলি সবখানে কম্পিউটারের দোকানে পর্নোগ্রাফির রমরমা ব্যবসা। এসব দোকানে দশ টাকা দিয়ে যে কেউ স্মার্টফোন ভর্তি করে পর্নো ছবি নিতে পারে। স্মার্টফোন যেহেতু সারাক্ষণের সঙ্গী, তাই যখন খুশি তখন ফোনের মালিক এসব ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে এসব ছবির দর্শকদের মনের বিকৃতি ঘটছে ও তাদের পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনছে। দেশে নিষিদ্ধ নীল ছবি বেচাকেনা বন্ধে কারও কোনো বিকার নেই। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সাবেক ইউএনও মো. শাহীনুজ্জামান একবার এই ব্যবসা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এটাই সম্ভবত সবে ধন নীল মণি। দেশের অন্য আর কোনো ইউএনও-ডিসি পর্নো ছবির বেচাকেনা বন্ধ করতে চান কি না বা এ বিষটি তাঁদের নজরে আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হয়।
সব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে গ্রাস করছে। মানবজীবনে এই মাধ্যমের প্রভাবকে আর অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই মাধ্যমে যেকোন ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নিমেষেই। ফলে কোথাও কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে অন্যরাও ঘটনার সাথে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সাথে মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ অন্যদেরেও ধর্ষণে প্রলুব্ধ করছে। সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য গ্রুপে যৌন উত্তেজনার সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধর্মের দোহায় আজ আর কোথাও কাজে আসছে না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলাও সমাজে ধর্ষণ বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
রাজনীতি করলে আর দল ক্ষমতায় এলে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায় এ দেশে। ক্ষমতাধরদের মধ্যে ধরাকে সরা জ্ঞান করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রতিপক্ষের মা-বোনদের ধর্ষণ করে ক্ষমতা প্রকাশ করার বর্বর সংস্কৃতি এ দেশে গড়ে উঠছে। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পূর্ণিমা শীলকে বিএনপির খলিল, লিটন, আলতাফরা ধর্ষণ করে। কারণ, সকল হিন্দু নৌকায় ভোট দেয়। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে পারুলকে আওয়ামী লীগের রুহুল আমীন মেম্বার ও তাঁর দলবল ধর্ষণ করে। কারণ, পারুলকে বলা সত্ত্বেও সে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। ক্ষমতা উদ্যাপনের এই পৈশাচিক প্রবণতা যে কারণে গড়ে উঠছে, তা হলো বিচারহীনতা।
বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের যেন মুক্তি নেই। অনেকের মনে থাকার কথা ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিক ক্যাম্পাসে মিষ্টি বিতরণ করে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদ্যাপন করেছিলেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যলয়টির তৎকালীন প্রক্টরের ভাগ্নে। কথায় আছে, মামা ভাগ্নে যেখানে, আপদ নেই সেখানে। এ দেশে মানিকের বিচার হয়নি। রাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি বিদেশে পালিয়ে নিরাপদ জীবন গড়েছেন।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর সোহাগী জাহান তনু ধর্ষিত ও খুন হলো। বিচার তো দূরে থাক, অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হতে বাধ্য, ‘নো ওয়ান কিলড তনু’। চলন্ত বাসে কিশোরগঞ্জের তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও এ দেশে কোনো সাড়া ফেলেছে বলে মনে হয়নি। অথচ ২০১২ সালে দিল্লিতে চলন্ত বাসে জ্যোতি সিংহ পান্ডেকে গণধর্ষণের ঘটনায় ভারতবর্ষ ফুঁসে উঠেছিল। ইন্ডিয়া গেটের সামনেসহ সারা ভারতে ঘটনাটির বিচার চেয়ে বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই ঘটনার বিচার হয়েছে। অভিযুক্তদের ফাঁসি হয়েছে। ফেনীর নুসরাতকে যৌন হয়রানি ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা শুধু হতবাক হয়েছি। আন্দোলন করার প্রয়োজন বোধ করিনি।
সমাজে ছড়িয়ে পড়া অনাচার বন্ধে সকলকে সোচ্চার হতে হবে। তা না হলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলারা আমাদের সকলকে একসময় পুড়িয়ে মারবে। দেশে বাড়তে থাকা ধর্ষণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। তা করতে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। পরিবার-সামাজসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বক্ষেত্রে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। একসময় আমাদের দেশে এসিড সন্ত্রাস মহামারি আকার ধারণ করেছিল। ‘এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২’-এ এসিড নিক্ষেপের শাস্তিÍ মৃত্যুদ- করার পর এর প্রকোপ কমে এসেছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ‘সত্যমেব জয়তে’ টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে বলিউডের সুপারস্টার আমির খান শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির চিত্র তুলে ধরার সাথে সাথে শিশুদের যৌন শিক্ষা দেওয়ার প্রয়াস করেছেন। সোহেল তাজ তাঁর ‘হটলাইন কমান্ডো’ প্রোগ্রামে এমনটি করলে আমরা খুশি হব। সব ধরনের গণমাধ্যমকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে গণসচেতনতা তৈরিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
সেঞ্চুরিয়ান মানিকের কা-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে স্মরণে রাখতে ও আর যাতে কোনো মানিক তৈরি না হয়, এ জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ আগস্ট ‘খুনি ও ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস’ পালন করা হয়। এই দিনটিকে ‘জাতীয় খুনি ও ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পালন করা যেতে পারে। যৌন শিক্ষাকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন আর যথাযথ শিক্ষাই পারে ধর্ষণের অভিশাপ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। সাথে সবার আগে পুরুষকে মানুষ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে।