দুই চালকসহ তিনজনের যাবজ্জীবন

47

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বাসচাপায় রাজধানীর রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় জাবালে নূর পরিবহনের দুই চালক ও এক সহকারীকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন ঢাকার আদালত। বছর দেড়েক আগের এই মৃত্যু সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল। আদালত অপরাধে সংশ্নিষ্টতা না পাওয়ায় জাবালে নূর বাসের মালিক জাহাঙ্গীর আলম ও হেলপার এনায়েত হোসেনকে খালাস দেন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ গতকাল রোববার তিন আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে এ রায় ঘোষণা করেন। দ-প্রাপ্তরা হলেন জাবালে নূর পরিবহনের দুই চালক মাসুম বিল্লাহ ও জুবায়ের সুমন এবং এক বাসের সহকারী কাজী আসাদ। এর মধ্যে কাজী আসাদ পলাতক থাকলেও রায় ঘোষণার সময় বাকি দু’জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এ মামলায় আরেক বাসের মালিক শাহদাত হোসেন আকন্দের বিচার হাইকোর্টে স্থগিত থাকায় রায় দেওয়া হয়নি। রায় ঘোষণার পর তাদের কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আসামিদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন ছাড়াও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাস কারাদ- ভোগ করতে হবে। এর আগে গত ১৪ নভেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করেন বিচারক। এ দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস হয় সড়ক পরিবহন আইন, যা গত ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
এ রায় শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীমের বাবা ও মামলার বাদী জাহাঙ্গীর আলম। মীমের বাবা বলেন, ‘এই রায়ে মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে। বাসচালকদের অদক্ষতা ও পাল্লাপাল্লিতে যে দুর্ঘটনা হলো, এর শাস্তি হওয়া তাদের জন্য দরকার ছিল। এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’ মীমের মা রোকসানা বেগম বলেন, ‘মেয়েকে তো আর ফিরে পাব না। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার দিয়া বড় হয়ে আইনজীবী হতে চেয়েছিল। তার স্বপ্ন অধরা থাকল। শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুলসংলগ্ন যে আন্ডারপাস নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটির নামকরণ মীম ও রাজীবের নামে হোক- এটাই আমার দাবি।’ এদিকে, এ রায়ে মোটামুটি খুশি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর ইসলাম বলেন, এ রায়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট। দু’’জন খালাস পেয়েছে। এটা নিয়ে একটু অস্বস্তি আছে। এ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা নিয়েও হতাশার জায়গা রয়ে গেছে।
পর্যবেক্ষণ :
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, পেনাল কোডের ৩০৪ ধারায় অপরাধজনিত নরহত্যার অভিযোগে এ মামলা করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তিই যাবজ্জীবন কারাদ-। এর চেয়ে বেশি শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। আপনারা এ-সংক্রান্ত সংবাদ এমনভাবে প্রচার করবেন, যাতে ছাত্রসমাজ ও জনগণের মধ্যে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি না থাকে। এ ধারায় এটাই সর্বোচ্চ সাজা। আদালত বলেন, পরিবহন সেক্টরে অনেক খামখেয়ালিপনা দেখা যায়। বাসের বেপরোয়া চলাচলের কারণে চাকার নিচে পিষ্ট হওয়া থেকে রেহাই পাচ্ছে না মানুষ। এ ঘটনায় ড্রাইভার, মালিক ও ট্রাফিক পুলিশকে আরও সচেতন হতে হবে। বিচারক বলেন, মালিকপক্ষকে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন অদক্ষ বাসচালক নিয়োগ না পায়। হালকা যানের লাইসেন্সধারী চালকদের কোনোভাবেই যেন ভারী যান চালক হিসেবে নিয়োগ করা না হয়। বিচারক আরও বলেন, মালিকরা চালকদের একটা নির্দিষ্ট জমা টাকার টার্গেট দেন, যেটা দেওয়া তাদের পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এ কারণে মালিকদের খুশি করতে চালকরা বেপরোয়া গাড়ি চালান। এ ব্যাপারে মালিকদেরও সচেতন হতে হবে।
দিয়া-রাজীব হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল ধানমন্ডিতে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘খুব দ্রুত বিচার হয়েছে। এ রায় অন্য দুর্ঘটনাকে নিরুৎসাহিত করবে। কিছু দুর্ঘটনা, কিছু অপরাধ হয়ে থাকে। তবে এ রায় এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে সহায়ক হবে।’ ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের জিল্লর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালে জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীর ওপর বাস তুলে দেয়। এতে ৯ ছাত্রছাত্রী গুরুতর আহত হয়। আহতদের মধ্যে রমিজ উদ্দিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীম (১৬) ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব (১৭) বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যায়। ঘটনার রাতেই নিহত দিয়ার বাবা দূরপাল্লার বাসচালক জাহাঙ্গীর আলম ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। বাসটির মালিক মো. শাহদাত হোসেন আকন্দ। এ ঘটনায় সারাদেশে শিক্ষার্থীদের প্রবল আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং অভিভাবকসহ বিভিন্ন মহলও আন্দোলনে সমর্থন জ্ঞাপন করে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর অন্যতম ছিল- দুই শিক্ষার্থীকে হত্যাকারী চালকের ফাঁসি, সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি না চলা, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এবং হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করা। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এক সপ্তাহ পর সরকারের আশ্বাসে ঢাকাসহ সারাদেশের সড়ক শান্ত হয় এবং গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন বিল-২০১৮ পাস হয়। পাস হওয়া আইনে সড়কে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে’ প্রাণহানি ঘটালে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়।
দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মুখ্য মহানগর আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক কাজী শরিফুল ইসলাম ছয়জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট জমা দেন। চার্জশিটটি বাংলাদেশ দ-বিধির ২৭৯, ৩২৩, ৩২৫, ৩০৪ ও ৩৪ ধারায় দাখিল করা হয়। ৩০৪ ধারা অনুযায়ী, খুন বলে গণ্য নয় এ রূপ নরহত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ-। এরপর ২৫ অক্টোবর আদালত আসামিদের অভিযোগ গঠন করেন। তদন্তে জানা যায়, জাহাঙ্গীরের বাসের ফিটনেসের মেয়াদ দুই বছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। ট্যাক্স টোকেনেরও মেয়াদ ছিল না। শাহদাতের বাসের রুট পারমিটই ছিল না। এ মামলার মোট আসামি ছয়জন। মামলায় ৪১ সাক্ষীর মধ্যে ৩৭ জন সাক্ষ্য দেন।