দাফন হবে মঙ্গলবার

51

এরশাদ অধ্যায়ের অবসান
জন্ম : ২০ মার্চ ১৯৩০-মৃত্যু :১৪ জুলাই ২০১৯
সমীকরণ প্রতিবেদন:
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর নেই। গতকাল রোববার সকাল পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত-সমালোচিত এই ব্যক্তিত্ব (ইন্নালিল্লাহি…..রাজিউন)। একাদশ জাতীয় সংসদে তিনি প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে ছিলেন। তার মৃত্যুতে দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। এরশাদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দেশের শীর্ষ রাজনীতিকরা শোক প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে এরশাদের গঠনমূলক ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন। এরশাদের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরে মাইলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম নামক রক্তের রোগে ভুগছিলেন এরশাদ। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ২২ জুন তাকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। ৪ জুলাই থেকে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। এর মধ্যে কয়েকবার তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে জানানো হয় জাতীয় পার্টির (জাপা) পক্ষ থেকে। ফলে দ্রুত তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে প্রত্যাশা ছিল দলীয় নেতাকর্মী ও ভক্ত-অনুরাগীদের। কিন্তু সেই আশা বৃথা করে পরপারে পাড়ি জমালেন ৯০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। গতকাল সকাল ৯টার দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও জাপার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে এরশাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
এরশাদের মৃত্যুর খবর পেয়ে সিএমএইচে ছুটে আসেন তার পরিবারের সদস্যরা। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে ছেলে শাদ এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে আসেন রওশন এরশাদ। মরদেহ দেখে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি এরশাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দেশবাসীর দোয়া চান। এরশাদের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ফেসবুকে আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন তার সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক। এদিকে, এরশাদের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতাল ও বনানীতে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন দলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের চোখ ছিল কান্নাভেজা। সহকর্মী ও সতীর্থদের জড়িয়ে ধরে তারা প্রিয় নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। গতকাল সকালে জাপার বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদকে আগামীকাল মঙ্গলবার সেনানিবাস কবরস্থানে দাফন করা হবে। যদিও জাতীয় পার্টির নেতারা এরশাদকে রাজধানীর কোনো উন্মুক্ত স্থানে দাফনের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, যাতে সাধারণ মানুষ তার কবর জিয়ারতের সুযোগ পায়। এ ছাড়া এরশাদের নিজ জেলা রংপুরে তাকে দাফন করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এরশাদের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর গতকাল সকালে রংপুরের দলীয় কার্যালয়ে এ দাবিতে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তারা। গতকাল সন্ধ্যায় জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ জানান, নেতাকর্মীরা চান এরশাদকে উন্মুক্ত জায়গায় দাফন করা হোক। তাই বিষয়টি নিয়ে ফের আলোচনা করে দাফনের জায়গা ঠিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, এরশাদের মৃত্যুর খবর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। কেউ তাকে পতিত স্বৈরাচার বলেছেন। তবে তার উত্তরসূরি হিসেবে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, তাদের তুলনায় এরশাদ ভালো ছিলেন বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, এরশাদের শাসনামলে প্রবর্তিত উপজেলা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখলের পর ৯ বছর দেশ শাসন করেন এরশাদ। শাসনামলের প্রায় পুরো সময় বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে ছিলেন তিনি। বিরোধীদের দেওয়া স্বৈরাচার তকমা তার নামের সঙ্গে আমৃত্যু জুড়ে থাকলেও জাতীয় পার্টির সমর্থকদের কাছে এরশাদ পরিচিতি পেয়েছেন ‘পল্লীবন্ধু’ হিসেবে। আর্থিক ও নারী কেলেঙ্কারিতে বারবার তার নাম জড়ালেও সমর্থকদের কাছে তিনি নায়ক হিসেবেই ছিলেন আমৃত্যু। বারবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অবস্থান পরিবর্তনের কারণেও তাকে ব্যাপক সমালোচনা সইতে হয়েছে। তবে ক্ষমতা থেকে পতনের পরও জাতীয় রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত নিজের গুরুত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
আপামর জনতা সরাসরি এরশাদের ব্যাপারে নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করলেও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। রাজনৈতিক গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এরশাদকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ পদ্ধতি বৈধ ছিল না। তবে তার শাসনামলের উপজেলা ব্যবস্থা, ওষুধনীতি, সারাদেশে সড়ক অবকাঠামো তৈরির মতো কাজগুলো অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়িত হবে। তবে তিনি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে দেশের ক্ষতি করেছেন। এরশাদের ক্ষেত্রে একটা বড় বিষয় হচ্ছে তিনি এমন একজন সামরিক শাসক, যিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন এবং নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। দিনভর আলোচনার মধ্যেই গতকাল জোহরের নামাজের পর সেনানিবাস কেন্দ্রীয় মসজিদে এরশাদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তার ছোট ভাই জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, জাপার সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে এরশাদের পার্থিব জীবনের ভুলত্রুটির জন্য দেশবাসী কাছে ক্ষমা চান জি এম কাদের।
আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় এরশাদের মরদেহ জাতীয় সংসদে নেওয়া হবে। দক্ষিণ প্লাজায় তার দ্বিতীয় জানাজা হবে। সেখান থেকে মরদেহ নেওয়া হবে জাপার কাকরাইলের কার্যালয়ে। এরপর বাদ আসর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে তৃতীয় জানাজা হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার এরশাদকে শেষবারের মতো নেওয়া হবে তার জন্মস্থান রংপুরে। সেখানে চতুর্থ জানাজা শেষে ঢাকায় মরদেহ ফিরিয়ে আনা হবে। এরশাদ বছরখানেক ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। একাদশ নির্বাচনের আগে ও পরে তিন দফায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নেন। নির্বাচনের পর শপথ নিতে হুইলচেয়ারে সংসদে যান। গত ২০ নভেম্বর তিনি শেষবারের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তৃতা করেছিলেন। তাতে বলেছিলেন, এ দেশে আর কোনো রাজনীতিবিদ তার মতো নির্যাতনের শিকার হননি। এরশাদ বরাবর আক্ষেপ করে বলতেন, তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারেননি। তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো ব্যবহার করে নব্বই-পরবর্তী সরকারগুলো তাকে মুক্ত মানুষ হতে দেয়নি। মামলা মাথায় নিয়ে মৃত্যু হয়েছে এরশাদের।
স্বৈরশাসক থেকে রাজনীতিবিদ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
মৃত্যু নয়তো নির্বাসন- ক্ষমতা থেকে পতনের পর অধিকাংশ সেনাশাসকের এমন পরিণতি হলেও ব্যতিক্রম ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি ২০১০ সালে সমকালের কাছে দাবি করেছিলেন, তিনি স্বৈরাচার ছিলেন না বলেই ক্ষমতা ছাড়ার পরও রাজনীতিতে টিকে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রায় সব দলের আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এরশাদ। ক্ষমতা ছাড়লেও পরের ২৯ বছর তিনি রাজনীতিতে ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে টিকে ছিলেন। কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির দিকে ঝুঁকতেন। সরকারের শরিক হিসেবে তিন দফায় ক্ষমতার স্বাদও পেয়েছেন এরশাদ। ক্ষমতা দখলকারী এক জেনারেল থেকে এরশাদের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার পথ ও কৌশল বেশ সমালোচিত, তার বিরোধীদের চোখে। তবে এরশাদ তার আত্মজীবনী ‘আমার কর্ম আমরা জীবন’-এ দাবি করেছেন, বাধ্য হয়ে তাকে ক্ষমতা নিতে হয়েছিল। রাজনীতিতে আসতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। এরশাদের দাবি, ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা নেওয়ার পর তার পরিকল্পনা ছিল, ‘দেশকে লাইনে তুলে দিয়ে’ দুই বছরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাবেন। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তার অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়। ৯ বছর ক্ষমতায় থাকা এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ২০ মার্চ রংপুরে নানার বাড়িতে। সার্টিফিকেট অনুযায়ী তার জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি। তার পৈতৃক বাড়ি ভারতের কোচবিহারের দিনহাটায়। সেখানেই শৈশব কেটেছে এরশাদের। তার ডাক নাম পেয়ারা। দিনহাটা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে রংপুরে আসেন। কারমাইকেল কলেজ থেকে ইন্টামিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এরশাদ। বিএ পাস করে ১৯৫২ সালে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।
১৯৭১ সালের মার্চে ছুটিতে দেশে ছিলেন মেজর এরশাদ। ২৫ মার্চের কালরাতের পর স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলেও তিনি ছুটি শেষে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান। এ জন্য এরশাদ বারবার সমালোচিত হয়েছেন। যদিও তার দাবি ছিল, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে না পারা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে ফেরেন এরশাদ। অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের জুনে বঙ্গবন্ধু সরকার তাকে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি দেয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার সময় ভারতে প্রশিক্ষণে ছিলেন এরশাদ। পঁচাত্তরের ২৪ আগস্ট এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে উপ-সেনাপ্রধান নিয়োগ করে বঙ্গবন্ধুর খুনি মোশতাক সরকার। ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। এরশাদকে করেন সেনাপ্রধান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর হাতে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এরশাদ তার রাজনৈতিক অভিলাষ খোলাখুলি প্রকাশ করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা দাবি করে আলোচনার জন্ম দেন। পরে চাপের মুখে অবস্থান বদল করে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু দুই মাসের মধ্যে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ আবদুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসেন এরশাদ। চার বছর সেনাশাসন জারি রাখেন। তবে এ সময় এরশাদকে ছাত্র আন্দোলন মোকাবেলা করতে হয়েছে। তিনি সামরিক উর্দি ছেড়ে ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদ উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কারণে প্রশংসা পেলেও সামগ্রিকভাবে তার শাসনামল ব্যাপক সমালোচিত। বিরোধীদের কাছ থেকে তিনি ‘বিশ্ববেহায়া’ তকমা পান। ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদ তার ‘স্বরচিত’ কবিতা ও গানের জন্য হাসির খোরাক হন। তার কবিতা সে সময়ে পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশ পেত। এরশাদের গান প্রতিদিন বাজানো হতো টিভি ও রেডিওতে। আর্থিক ও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে সমালোচিত হন এরশাদ। তাকে ‘গরিব দেশের ধনী রাষ্ট্রপতি’ বলা হতো।
এরশাদের শাসনামল বেশি সমালোচিত হয় দল ভাঙানো ও রাজনৈতিক ডিগবাজির কারণে। ১৯৮৬ সালে বিভিন্ন দল ভেঙে এরশাদ প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় পার্টি। মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একাংশ ও আবদুল মতিনের নেতৃত্বাধীন বিএনপির একাংশ যোগ দেয় এতে। পূর্ববাংলার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, ব্যারিস্টার মওদদুদ আহমদ, কাজী জাফর আহমদসহ অনেক রাজনীতিবিদ যোগ দেন এরশাদের সঙ্গে। এসব নেতার অনেকেই পরে এরশাদকে ছেড়ে যান। জাতীয় পার্টি অন্তত চারবার ভাঙে। ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। আন্দোলনের মুখে এরশাদ ওই সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৯৮৮ সালে ফের নির্বাচন দেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রায় সব দল ওই নির্বাচন বর্জন করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয়। একতরফা নির্বাচন এরশাদকে স্বৈরাচারের কুখ্যাতি এনে দেয়। গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা থেকে পতনের পর এরশাদের ঠিকানা হয় জেলখানায়। টানা ছয় বছর এক মাস কারাগারে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ৪৩টি মামলা হয়। দুর্নীতির দায়ে দুটি মামলায় তার সাজা হয়। আমৃত্যু তিনি মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যার আসামি ছিলেন। তবে খালাস ও অব্যাহিত পান ২৭টি মামলায়। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, ক্ষমতা ছাড়ার পর কখনও স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারেননি তিনি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫ আসন পায়। এরশাদ কারাগারে থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩২ আসন পায়। এরশাদ ফের কারাগারে থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে জয়ী হন। ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি এরশাদ জেল থেকে জামিনে ছাড়া পান।
কারামুক্তির পরের এরশাদের ২২ বছর রাজনৈতিক জীবন ডিগবাজি ও ক্ষণেক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলের। ১৯৯৯ সালে তিনি আওয়ামী লীগের ঐকমত্যের সরকার ছেড়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেন। সমকালকে ২০১০ সালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এরশাদ দাবি করেন, তিনিই ছিলেন জোটের রূপকার। এরশাদ ফের ২০০০ সালে আলোচিত ছিলেন তার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে। ওই বছর প্রকাশ পায় এরশাদ বছর দুই আগে বিদিশা সিদ্দিক নামের এক ফ্যাশন ডিজাইনারকে বিয়ে করেছেন। শাহাতা জারাব এরিক এরশাদ নামে তাদের এক বছর বয়সী ছেলে আছে। রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠা বিদিশাকে ২০০৪ সালে তালাক দিয়ে ফের আলোচনার জন্ম দেন এরশাদ। বিদিশার বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেন। ২০০৬ সালে আবার নাটকীয়তার জন্ম দেন তিনি। বিএনপির সঙ্গে জোট করার আলোচনায় থেকেও যোগ দেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে। তিন দিন ‘অন্তর্ধান’ শেষে ২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর নাটকীয়ভাবে মহাজোটের পল্টনের সমাবেশে যোগ দেন। ২০০৬ থেকেই মহাজোটে রয়েছেন এরশাদ। তিনি বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে আবারও আলোচনার জন্ম দেন। ভোট বর্জন করলেও মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন। তবে তার স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একাংশ ভোটে অংশ নেয়।
২০০৯ সাল থেকে নরমে-গরমে ছিলেন এরশাদ। কখনও সরকারের কড়া সমালোচনা করতেন, আবার কখনও আওয়ামী লীগের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির চেয়ে প্রায় চারগুণ আসন বেশি পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয় জাতীয় পার্টি। তবে ভোটের আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন এরশাদ। তিনি গত বছরের ২০ নভেম্বর শেষবারের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তৃতা করেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, অন্য কোনো রাজনীতিক তার মতো নির্যাতনের শিকার হননি। গত নির্বাচনের আগে-পরে চারবার সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নেন এরশাদ। ছিলেন না ভোটের প্রচারেও। নির্বাচনের পর প্রথমে ছোট ভাই জিএম কাদের এবং পরে স্ত্রী রওশন এরশাদকে উপনেতা করে তিনি নিজেই বিরোধীদলীয় নেতার পদে বসেন। আমৃত্যু এ পদে ছিলেন। তবে সংসদে গিয়েছিলেন মাত্র একদিন, হুইল চেয়ারে করে।