থেমে নেই অর্থ পাচার

25

পাচারের দিক থেকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
অপ্রতিরোধ্য গতিতে দেশ থেকে টাকা পাচার চলছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। এর বেশির ভাগই পাচার হয়েছে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে। ওই রিপোর্টের তথ্যমতে, বিশ্বের ১৪৮টি দেশের মধ্যে অর্থ পাচারের দিক থেকে ১৯তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশের নাম। আর গত বুধবার জাতিসংঘের শিল্পবাণিজ্য সংস্থা আঙ্কটাডের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বছরে যত টাকা কর আদায় করে তার ৩৬ শতাংশের সমান টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। প্রতি বছর দেশ থেকে এ হারে পুঁজি পাচারের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সামগ্রিক বিনিয়োগ। আর অর্থ পাচারের দিক থেকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে জিএফআই ও আঙ্কটাড।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা ও পুঁজি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় প্রতি বছর দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে যারা অর্থ পাচার করছেন তাদের বেশির ভাগই মালয়েশিয়া, কানাডা, সিঙ্গাপুর, দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম গড়ে তুলছেন। পাচার ঠেকাতে হলে সবার আগে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তবে শুধু যে বাংলাদেশ থেকেই অর্থ পাচার হচ্ছে তা নয়, বিশ্বের অন্য দেশ থেকেও অর্থ পাচার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে এমন তথ্য দিয়েছে জিএফআই। আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে প্রায় সব দেশ থেকেই কমবেশি অর্থ পাচার হয়। এসব দেশের কর আদায়ের ৩৬ থেকে ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়ে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রতি বছর কর-রাজস্ব আদায় করেছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। আঙ্কটাডের দেওয়া তথ্য বিবেচনা করলে ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকার মতো পাচার হয়েছে। যা দিয়ে অন্তত দুটি পদ্মা সেতু বানানো যেত।
আঙ্কটাড বলছে, আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রমের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য হয়, এর ৭ শতাংশের সমপরিমাণ হয় মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে। এর পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। তাই আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি কয়েকটি গ্রুপ ও কোম্পানি আমদানি-রপ্তানির নামে অর্থ পাচার করেছে এমন অভিযোগে কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কেউ কেউ আবার জেলেও রয়েছেন। পাচারের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি-রপ্তানির আড়ালে হয়ে পাচার হয়ে থাকে বলে তথ্য দিয়েছে জিএফআইসহ আরও দেশি-বিদেশি একাধিক গবেষণা সংস্থা। জিএফআইয়ের ওই প্রতিবেদনে ১৪৮টি উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থ পাচারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে অর্থ পাচারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। ২০১৪ সালের জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বা সাড়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছিল। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ২৭ হাজার কোটি টাকা পাচার কম হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ পাচারের এই পরিমাণ অনেক বেড়েছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পরিস্থিতির টালমাটাল অবস্থা। এ ছাড়া ব্রেক্সিট ইস্যুতে উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও বিরোধ বাড়ছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধও বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতকে চরমভাবে প্রভাবিত করছে। যার ফলে অর্থ পাচারের মতো ঘটনাগুলো বাড়ছে। এর প্রভাবমুক্ত নয় এশিয়ার দেশগুলোও। এমনকি স্বল্পোন্নত দেশগুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। বিশ্ব বাণিজ্যে নিজের বাজার ধরে রাখাও এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গোষ্ঠী বন্ডেড ওয়্যার হাউসের অপব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খুব সহজেই বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক বনে যাচ্ছেন। এ ছাড়া নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ পন্থায় প্রভাবশালীরা খুব সহজেই অবৈধ পথে আয় করছেন, যা পরবর্তীতে কালো টাকা বলে পরিগণিত হয়। এই টাকা করবহির্ভূত হওয়ায় বৈধভাবে বিনিয়োগও করতে পারেন না। ফলে তা বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থ পাচার ঠেকাতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্য আমদানি-রপ্তানিসহ সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা-জবাবদিহতিা নিশ্চিত করতে হবে। তবে সবার আগে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে মনে করেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।