তাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে -হারুন-উর-রশীদ

4215

18217825_1287417494699583_1447057067_nতাল গাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
-হারুন-উর-রশীদ
তাল গাছ গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অনাদিকাল ধরে। কবি তার গ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ’। গ্রামের মেঠো পথের ধারে বা দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা মাঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। আপনি যদি চুয়াডাঙ্গা জেলায় অবস্থিত ডিসি ইকোপার্কে যান কখনও তাহলে এর প্রবেশ পথ ‘তালসারি’(রাস্তার দু’ধারে লাগানো তাল গাছের সারি) দর্শন হবে আপনার জীবনে তাঁজমহল দর্শনের মত লাইফ টাইম অভিজ্ঞতা। এই অপরূপ সুন্দর রাস্তাটি তৈরির গল্পটি বেশ চমৎকার। অবিভক্ত বাংলার জমিদারি শাসনামল- অত্র এলাকার দাপুটে জমিদার শ্রী নফর পাল চৌধুরীর স্ত্রী রাধারানী ইচ্ছা পোষণ করলেন ছায়াঘেরা পথে কৃষ্ণনগর যাওয়ার। রাধা রানীর ইচ্ছা পূরণ করতেই জমিদার নাটুদাহ থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত সড়ক ছায়া সুনিবিড় করার উদ্যোগ নেন। তাঁর পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলেও প্রায় ১২ কিলোমিটার রাস্তার সঙ্গে এক কিলোমিটার পর পর ফলবাগান গড়ে তোলা হয়। এ ছাড়াও রাস্তার দুই পাশে বিভিন্ন জাতের গাছ রোপণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় জাম, কাঁঠাল, কলা ইত্যাদি গাছের সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে; কিন্তু বহুবর্ষজীবী হওয়ায় ওই সময় লাগানো তালগাছগুলো এখনো একপায়ে দাঁড়িয়ে পথিককে ছায়া আর ফল দিয়ে যাচ্ছে। এই পাখি ডাকা, ছায়াঘেরা পথ আপনাকে মুগ্ধ করবেই ।index

এতো গেল প্রেয়সীর ইচ্ছা পূরণের রোমান্টিক গল্প। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি, বাঁশি কই আগের মতো বাজে না, মন আমার তেমন কেনো সাজে না’ গানটি গায়নি এমন বাঙালি যুবক বিরল। প্রচ- গরমে তালপাতার হাত পাখার বাতাস আপনার দেহ মনকে শীতল করবেই। আর তা যদি হয় প্রেয়সীর হাতে তবে তা বেহেস্তী বাতাসসম। তালের পিঠা, তালের আঁটির শাঁশ, তালকুরর, তালের রস সব বয়সী মানুষের প্রিয় খাবার। বিশেষ করে  অতীত সময়ে তাল পিঠা ছাড়া আত্মীয়তা কল্পনা করা যেত না। বাঙালির জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তাল গাছ। কিন্তু সমস্যাটা বাঁধে যখন এর অবস্থান আর মালিকানার নিয়ে প্রশ্ন জাগে। তাল গাছ সাধারণত জমির আইল-এ লাগানো থাকে। কবিতার পরের লাইন যেহেতু ‘ওই খানেতে বাস করে কানা বোগির ছা’। সে দীর্ঘদিন ধরে তালগাছে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে, সেহেতু তালগাছের প্রকৃত মালিক হওয়ার কথা ছিল উল্লেখিত কানা বোগির বংশধরদের। কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করি, তালগাছের মালিক হওয়ার জন্য মনুষ্য প্রজাতির মধ্য থেকে বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দাবি উপস্থাপন করে। আর যারা এ দাবি উপস্থাপন করে, তারা অঙ্গীকার করে যে তারা বিচার মানে। বিচার মানলেও তালগাছের মালিক অন্য কেউ হয়ে যাবে, এটা তারা মানতে পারে না । আমাদের দেশের বাস্তবতায় ‘সব মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার’ এই প্রবাদটি শুনেনি এমন বাংলাদেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না । এই তাল গাছ নিয়ে ঠেলাঠেলির ফলে আমাদের দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক জোট জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোন ঐকমতে পৌঁছাতে পারছে না। এমন কী জাতিসংঘ, ইইউ, দাতাসংস্থাসহ বিদেশি বন্ধুরাও তাল গাছের প্রকৃত মালিক কে তা ঠিক করে দিতে পারছে না। শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তাল গাছটা কার হবে এ বিষয়ে সালিশ বসবে ইউরোপের কোন একটা দেশে। এরই প্রস্তুতি স্বরূপ মাঝে মাঝে দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুখ থেকে তাদের অবস্থান ও নতুন নতুন ফরমূলা আমরা গণমাধ্যমের কল্যাণে জানতে পারি ।

রাজনৈতিক কাদা ছুঁড়াছুঁড়ির ময়দান থেকে তাল গাছের সাম্প্রতিক দেশে গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমানোর জন্য দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগাচ্ছে সরকার। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতার আলোকে বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তালগাছ রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। তাদের মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানোর জন্য এটাই সবচেয়ে কার্যকর স্থানীয় প্রযুক্তি। গতবছর সংবাদমাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয় ছিল দেশে বজ্রপাতে একদিনেই ৮২ জনের নিহত হবার ঘটনা । আবহাওয়া অধিদপ্তরের তালিকায় ২০১০ সাল থেকে দেড় হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়েছেন বজ্রপাতে। দুর্যোগ ফোরামের গবেষণায়, ২০১১ সালে ১৭৯ জন, আর ২০১৫ সালে ২৭৪ জন জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। গতবছরে বজ্রপাতে মৃত্যুর শিকার প্রায় সাড়ে চারশ মানুষের বেশিরভাগই হাওর অঞ্চলের ৯ জেলার। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল সুনামগঞ্জে। বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল ছাড়াও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ফসলের মাঠে বা ফাঁকা জায়গায়। এসব মৃত্যুর ঘটনায় কালবৈশাখী-ঘূর্ণিঝড়,বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, অগ্নিকা-ের সঙ্গে নতুন দুর্যোগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বজ্রপাত।

আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনো বড় গাছের ওপর পড়ত। বজ্রপাত এক ধরনের বিদ্যুৎ রশ্মি। ওই রশ্মি গাছ হয়ে মাটিতে চলে যেত। এতে মানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের প্রায় সর্বত্রই তালগাছসহ বড় বড় গাছের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলেও আর তালগাছ দেখা যায় না। একইভাবে বড় আকারের গাছও এখন তেমন নেই। সরকারি চাকুরী পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন প্রায় আসে, হঠাৎ বজ্রপাত হলে আপনি কি করবেন ? এর উত্তরে আপনি চোখ বুজে উত্তর দিতে পারেন-তাল গাছের নিচে অবস্থান করব । কেননা নিজের মাথায় প্রকৃতির বজ্রবানের আঘাত নিয়ে মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু তাল গাছ আপনার জীবন রক্ষা করবে তার জীবন দিয়ে । কবিগুরুর সুরের সাথে সুর মিলিয়ে বলি- তাল গাছ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে; সারা দেশজুড়ে যত বেশি তাল গাছ বাংলার আকাশে উঁকি মারবে তত বেশি মানুষের জীবন বাঁচবে ।