তামাকের ব্যবহার উন্নয়নের পথে বাধা

379

আজ ৩১মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের ন্যায় বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ গুরুত্ব সহকারে পালিত হবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ঞড়নধপপড়-অ ঞযৎবধঃ ঃড় উবাবষড়ঢ়সবহঃ অর্থাৎ তামাক উন্নয়য়ের পথে হুমকিস্বরূপ। তামাকের ব্যবহারে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ছাড়াও আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে বিধায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি প্রতিহত করা ছাড়াও আর্থসামাজিক অবস্থা ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তামাক উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করা গেলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেঙে কৃষি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা সম্ভব। তামাকের উৎপাদনে কীটনাশক ও সার ব্যবহার করার ফলে পানি বিষাক্ত হয় ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তামাকের উত্পাদনে ৪.৩ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রয়োজন হয়, যার ফলে বিশ্বে প্রতি বছর ২ হতে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বনায়ন সঙ্কুচিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যগত দিক থেকে বলতে গেলে তামাকের কারণে ক্যানসার, হার্টের বিভিন্ন রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট ও পায়ে পচন এবং ধোঁয়াবিহীন তামাক, জর্দা ও সাদাপাতা ব্যবহারের ফলে খাদ্যনালীতে ক্যানসারসহ নানা শারীরিক জটিলতা সম্পর্কে এখন আর কারও অজানা নয়। বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার সম্পর্কে বলতে গেলে এখানে ধূমপায়ীর হার ৪৩ শতাংশ। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারকারী মহিলার হার ২৮ শতাংশ এবং পুরুষ ২৬ শতাংশ। সিগারেট ব্যবহারকারী পুরুষ ৪৫ শতাংশ এবং মহিলা ১.৫ শতাংশ। বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকের কারণে প্রায় এক লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ৩ থেকে ৪ লাখ লোক তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণে অসুখ ও অক্ষমতাজনিত কুফল ভোগ করে। বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে তামাকের কারণে প্রতি বছর ৬০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। যার মধ্যে ৬ লাখ পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মৃত্যুবরণ করে। তামাকের ব্যবহার অনিয়ন্ত্রিত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রতি বছর এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৮০ লাখ, যার ৮০ শতাংশ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে হবে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাকে ৫০টির বেশি পদার্থ ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এসব কারণে তামাকের ব্যবহার প্রতিরোধ করা জরুরি। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এবারে প্রতিপাদ্য বিষয় তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা এবং প্রমোশনাল কার্যক্রম বন্ধ করে একটি রোগমুক্ত সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে গিয়ে প্রায় সময় অভাবের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। গরিব ধূমপায়ীর আয়ের অংশ তামাকের ব্যবহারে খরচ করার কারণে খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। পাশাপাশি তামাক ব্যবহারের কারণে অসুস্থ থাকে বিধায় চিকিত্সা খরচ তাদের জন্য একটি বাড়তি বোঝা এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণে পরিবারের আয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। যেহেতু তামাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একক কৌশল পুরোপুরি কার্যকর নহে, তাই সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বেশি হারে কর আরোপের বিষয়টিও কার্যকর রাখতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, তামাকের ওপর ১০ শতাংশ করারোপ করা হলে উন্নত দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ৪ শতাংশ হ্রাস পায়। অপরদিকে মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার হ্রাস প্রায় ৮ শতাংশ। অতএব তামাকের ওপর বেশি হারে করারোপ করা গেলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হবে, যা পরবর্তী সময়ে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হবে। তামাক কোম্পানিগুলো বেশ কৌশলী। তারা জনগণের শুভাকাঙ্ক্ষী রূপ ধারণ করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, হেলথ ক্যাম্পের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। এসব কর্মসূচির আসল উদ্দেশ্য হল তামাকের বাজার ও বিক্রয় বাড়ানো। সচিত্র সতর্কবাণী ও কর আরোপের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর এসব কর্মসূচি প্রতিহত করা গেলে তামাকবিরোধী আন্দোলন সুফল বয়ে আনবে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে তামাকের ব্যবহার বন্ধ করা গেলে তামাকমুক্ত সমাজ গড়ার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।