তলবের সন্তোষজনক জবাব দেয়নি মিয়ানমার

28

রাখাইনে ব্যাপক সেনা অভিযানে বাংলাদেশমুখী মানব ঢলের শঙ্কা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুতদের বড় ধরনের ঢল আবার বাংলাদেশ অভিমুখে আসার আশঙ্কা করছে সরকার। তবে এবার কেবল মুসলিম রোহিঙ্গা নয়, রাখাইনের বৌদ্ধদেরও বাংলাদেশ অভিমুখী ঢলের আশঙ্কা রয়েছে। এ আশঙ্কাকে সামনে রেখে সীমান্ত রক্ষীদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। এ দিকে রাখাইনে অস্বাভাবিক হারে সৈন্য সমাবেশ এবং বাংলাদেশ সীমান্তে সন্দেহজনক গতিবিধির সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি মিয়ানমার। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে এর কারণ জানতে চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানতে চেয়েছিল, রাখাইনে বিপুল পরিমাণ সেনা মোতায়েনের কারণ কী? নাফ নদীতে বেসামরিক নৌযানে সেনা চলাচল করছে কেন? এবং রাখাইনের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত অভিযানে গোলোন্দাজ বাহিনী (আর্টিলারি), হেলিকপ্টার বা যুদ্ধ বিমান কেন ব্যবহার করতে হচ্ছে? এসব প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনে পুরনো সৈন্যদের সরিয়ে নতুন সৈন্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এ কারণে সাময়িকভাবে সৈন্য সমাবেশ বেড়ে গেছে। তবে সৈন্যদের এই মুভমেন্টের জন্য বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। তবে বেসামরিক নৌযানে সৈন্যদের চলাচল বা রাখাইনে পরিচালিত অভিযানে আর্টিলারি, হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমানের ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো জবাব মিয়ানমার দেয়নি।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, রাখাইনের স্বায়ত্তশাসনের জন্য সঙ্ঘাতে লিপ্ত আরাকান আর্মির পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় লড়াইরত আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মিকে (আরসা) দমন করতে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চলছে বলে মিয়ানমার দাবি করছে। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরে এসব গোষ্ঠীকে দমনে মিয়ানমার যে ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে তা অস্বাভাবিক। কেননা মর্টর বা আর্টিলারি সমরাস্ত্র ব্যবহারের কারণে বাছবিচারহীনভাবে মানুষ হতাহত হচ্ছে, বাড়িঘর ধ্বংস হচ্ছে। এর ফলে রাখাইন অঞ্চলে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এ সব বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশ অভিমুখে আসতে পারে। ২০১৭ সালে আরসার বিরুদ্ধে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালানোর নামে জাতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার অভিযান চালানো হয়েছিল। এর ফলে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এখন রাখাইনে থেকে যাওয়া অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা সীমান্ত পার হতে চাইলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নবাদীদের দমনে সেনা অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু এজন্য আর্টিলারি ব্যবহার করা হয়নি। রাখাইনে বিপুলসংখ্যক সৈন্যের পাশাপাশি ভারী যুদ্ধাস্ত্রের সমাবেশ বাংলাদেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ২০১৭ সালের আগস্টে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালানোর আগে মিয়ানমার একই ধরনের তৎপরতা চালিয়েছিল। তারা বলেন, আরসার পাশাপাশি আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে দমন অভিযানের কারণে অনেক বৌদ্ধও প্রাণ নিয়ে পালাতে চাচ্ছে। ২০১৮ সালে বান্দরবন সীমান্তে রাখাইনের বৌদ্ধদের বাংলাদেশ অভিমুখে আসার একটি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছিল। চলতি বছর এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে কক্সবাজার সীমান্তে মিয়ানমার অধিবাসীদের বড় ধরনের অনুপ্রবেশের চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে। কিন্তু রাখাইনের পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন করে আর কোনো শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার সুযোগ বাংলাদেশে নেই।
মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভিযানের কারণে রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যসরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। টেলিকমিউনিকেশনসহ যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তার অজুহাতে এসব অঞ্চলে জাতিসঙ্ঘসহ অন্য কোনো মানবিক সংস্থাকে প্রবেশাধিকার দেয়া হচ্ছে না। রাখাইনে গণহত্যার মতো যুদ্ধাপরাধ আবার সংঘটিত হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচিলেট। গত সোমবার জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪৫তম অধিবেশনে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধান এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে তাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার ব্যাপারে মিয়ানমার বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু উপগ্রহ চিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও মিয়ানমার উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলো নিশ্চিহ্ন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক।
এ ব্যাপারে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন গতকাল সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতার কারণে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যেকোনো কাজ অবশ্যই আমাদের সন্দেহের চোখে দেখতে হবে। কেননা তারা সবকিছু পরিকল্পনা করেই করে। তাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক মুভমেন্টের পেছনে খারাপ কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে প্রাথমিকভাবে ধরে নিতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। মিয়ানমারের উত্তর সন্তোষজনক হোক বা না হোক, বিষয়টা এখন ‘অন রেকর্ড’। তিনি বলেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদের সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের সম্পূর্ণভাবে বিতারণ করার জন্য তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। ২০১৭ সালের জাতিগত নির্মূল অভিযানের পরও যে সব রোহিঙ্গা রাখাইনে থেকে গেছে, তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আটক বা বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের সহায়তায় কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে।
তবে রাখাইনে থেকে বৌদ্ধদের বিতারণ করার আশঙ্কা সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করেন তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্ঘাত চলছেÑ এ কথা ঠিক। তবে র্ধর্মীয় নয়, বরং ইতিহাসকে ভিত্তি করে এই সঙ্ঘাত। আরাকান খুব অল্প সময়েই বার্মার অধীনে ছিল। এর আগে এ অঞ্চল স্বাধীন ছিল। পরে ব্রিটিশ উপনিবেশের আওতায় আসে। কিন্তু দেশ ভাগের সময় ব্রিটিশরা এই অঞ্চলকে বাংলার অন্তর্ভুক্ত করেনি। আর সমস্যাটার সৃষ্টি সেখান থেকেই। স্বায়ত্তশাসন দাবি করা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালালেও সার্বিকভাবে বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে ক্ষেপানোর ঝুঁকি মিয়ানমার সেনাবাহিনী নেবে না। কেননা বৌদ্ধরাই মিয়ানমারে সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, জাপানসহ বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর কাছ থেকে মিয়ানমার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন পেয়ে আসছে।