ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে

59

সমীকরণ প্রতিবেদন:
সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত রোববার গ্রেপ্তার হওয়ার পর গতকাল তাঁকে সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে আসামি পক্ষে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। বাদি পক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। আদালতে বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। এ মামলায় আগামী ৩০ জুন আসামির উপস্থিতিতে চার্জ শুনানির জন্য পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন আদালত। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা ২৬ মিনিটে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রিজন ভ্যানে করে মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে হাজির করে পুলিশ। ওই সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতির কারণে তাঁকে প্রিজন ভ্যান থেকে না নামিয়ে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নেয় পুলিশ। পরে বেলা ২টার দিকে সিএমএম কোর্টের হাজতখানা থেকে আবার মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে প্রিজন ভ্যানে করে আনা হয়। এরপর তাঁকে হাতকড়া ছাড়াই প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে লিফটে করে মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনের ছয় তলায় অবস্থিত সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে নেয়া হয়। তখন প্রায় ২টা ২০ মিনিট। প্রিজন ভ্যান থেকে আদালতে উঠানোর সময় প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা ছবি তুলতে ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে অনেক সাংবাদিক আহতও হন। মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতে উঠানোর পর তিনি কাঠগড়ার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন তাঁর চোখে সানগ্লাস, মুখে দাড়ি, পরনে প্যান্ট এবং গায়ে পোলো শার্ট ছিল। তাকে কিছুটা বিচলিত দেখাচ্ছিল। ট্রাইব্যুনালের ভেতরেও পুলিশ তাঁকে ঘিরে ছিল।
বিচারক আগে থেকে এজলাসে ছিলেন। তাই মোয়াজ্জেম হোসেনকে কাঠগড়ায় উঠানোর দুই মিনিট পরই এ মামলার শুনানি শুরু হয়। প্রথমে আদালতের পেশকার শামীম আল মামুন আসামিকে কাঠগড়ায় উঠতে বললে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড়ান। এরপর শুনানিতে মামলার বাদি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন প্রথমে বলেন, আদালত ২০ দিন আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আসামি একজন আইনের রক্ষক। তিনি যদি নির্দোষ হতেন তবে আইনের লোক হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, পালিয়ে ছিলেন। আদালত এখন আপনিই সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দেবেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, আসামি পলাতক ছিল। আইনের লোক হয়েও আদালতে আসেনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। জামিন পেলে পলাতক হবে। আসামি পক্ষের আইনজীবী কাজী শাহানারা ইয়াসমিন জামিনের আবেদন করেন তাকে সহযোগিতা করেন ফারুক আহমেদ। আইনজীবীরা উনি (ওসি মোয়াজ্জেম) পলাতক ছিলেন না। তিনি আইনের আশ্রয়ের জন্য হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন। রোববার আত্মসমর্পণের জন্যই তিনি হাইকোর্টে যান। সেখান থেকেই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। যদিও পুলিশ তা স্বীকার করেনি। বলছে, শাহবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার অভিযোগ সম্পর্কে এ আইনজীবী বলেন, মামলায় বলা হয়েছে, তাঁর (ওসি মোয়াজ্জেম) আইডি থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাঁর আইডি থেকে ভিডিও ছড়ানো হয়নি। ছড়ানো হয়েছে মো: আতিয়ার হাওলাদার সজল নামে এক সাংবাদিকের আইডি থেকে। অথচ তাঁকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি যা রহস্যজনক বরং সজলের আইডি থেকে ভিডিও ছড়ানোর কথা জানতে পেরে তিনি গত ১৪ এপ্রিল থানায় একটি জিডি করেন। তাই মোয়াজ্জেম হোসেন এ মামলায় আসামি হতে পারেন না। তিনি জামিন পেতে পারেন। ওই সময় বিচারক আইনজীবীকে জিজ্ঞেস করেন যে, মোয়াজ্জেম হোসেন ভিডিওটি করেছিলেন কি না? এ প্রশ্নের বিষয়ে আইনজীবী সরাসরি কোনো জবাব দেননি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি নিয়ে ফেসবুকে লাইভকারী আলোচিত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন গত ১৫ এপ্রিল আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় গত ২৭ মে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ওই দিনই মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। পরোয়ানা জারির ২০ দিন পর রোববার হাইকোর্টের সামন থেকে মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে ঝলসে দিয়ে হত্যাকা-ের শিকার মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দীর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়ানোর অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানাতে সোনাগাজী থানায় জান নুসরাত। থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সে সময় নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন করে বিব্রত করেন এবং তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে আদালতের নির্দেশে সেটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।