ঝরে গেল তরতাজা যুবকের প্রাণ: ভেঙে গেল পরিবারের স্বপ্ন

253

চুয়াডাঙ্গা প্রধান ডাকঘরের সামনে ওভারটেকিং : মালবাহী ট্রাকের নিচে মোটরসাইকেল চালক
ঝরে গেল তরতাজা যুবকের প্রাণ: ভেঙে গেল পরিবারের স্বপ্ন
এম এ মামুন/উজ্জল মাসুদ: সড়ক দূর্ঘটনায় প্রতিদিন ঝরছে তাজা প্রাণ। খালি হচ্ছে বহু মা-বাবার বুক। ভেঙে যাচ্ছে লালিত সব স্বপ্ন। তেমনি একমাত্র পুত্র সন্তান মাহফুজুর রহমান বাপ্পিকে (২৮) হারিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরের নিচের বাজারের মুদি ব্যবসায়ী ও শহরতলীর দৌলদিয়াড়ের বাদল মিয়ার স্বপ্নের বাগান তছনছ হয়ে গেছে। গতকাল বিকেলে শহীদ আবুল কাশেম সড়কের পোস্ট অফিসের সামনে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারায় বাপ্পি। শত অভাব অনটনের মাঝেও একমাত্র ছেলে বাপ্পিকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনছিল মুদি ব্যবসায়ী বাদল মিয়া। কষ্টের মেঘ নিজের আকাশে দেখলেও সংসার ও ছেলে মেয়েকে কখনও বুঝতে দিতেন না তিনি। ছেলেকে নিয়ে দেখা বড় স্বপ্নের মধ্যে ছিল তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবে। তাই নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নানা সমস্যা থাকলেও বাপ্পিকে উচ্চ শিক্ষার জন্য চুয়াডাঙ্গা সরকারী কলেজে ভর্তি করায়। কিন্তু বাবার অসুস্থ্যতার কারণে এইচএসসি পাশ করার পর বাপ্পি আর লেখাপড়া না করে বাবার ব্যবসা পরিচালনার কাজে মন দেয়।
সম্প্রতি ঢাকা বিমানবন্দরে একটি চাকরিও হয় তার। কিন্তু চাকরিতে গেলে বাবার ব্যবসা বন্ধ হবে এবং বাবা মাকে দেখার কেউ থাকবে না। এই ভেবে বিমানের চাকরিও ত্যাগ করে বাপ্পি। এত কিছু যার ভাবনা ও স্বপ্ন  সেই স্বপ্নের আকস্মিক এবং মর্মান্তিক মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না বাপ্পির মা বাবা ও প্রতিবেশীরা। মাহফুজুর রহমান বাপ্পির মৃত্যুতে দৌলতদিয়ায়ের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে সৃষ্টি হয়  এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য।

যেভাবে ঘটলো এ দূর্ঘটনা: গতকালও যোহরের নামাজ শেষে বাবার জন্য দোকানে ভাত দিয়ে আসে বাপ্পি। এরপর বাড়ী ফিরে খাওয়া শেষে বিকেল চারটার দিকে দোকানের হালখাতার কার্ড বিলির জন্য তার সম্প্রতি নিজের কেনা হাইড্রোলিকযুক্ত টিভিএস মেট্রো মোটরসাইকেল নিয়ে শহরের বড়বাজার হয়ে রেলবাজারের দিকে যাচ্ছিল বাপ্পি। ওই সময়ের সিসি ক্যামেরার ভিডিও  ফুটেজে দেখা যায়, বাপ্পি শহরের পোষ্ট অফিসের সামনে একটি ট্রাককে অতিক্রম করতে গেলে তার সামনে অপর একটি মোটরসাইকেল দেখে। তখন ওই মোটর সাইকেলটিকে বামে রেখে ও ডানে ট্রাক এর মাঝ দিয়ে বের হতে গেলে এসময়  সম্ভবত হাইড্রোলিক ব্রেক কষলে নষ্ট রাস্তার আলগা পাথর বালিতে তার মোটরসাইকেলের চাকা পিছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেলসহ  ট্রাকের সামনে সামনে পড়ে যায়। এসময়  ট্রাকটি তার মোটরসাইকেলসহ তাকে নিয়ে প্রায় ১০ হাত ছেঁচড়িয়ে নিয়ে যায়। ড্রাইভার ও হেলপার বুঝতে পেরে  ট্রাক ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। এই দূর্ঘটনায় মাহফুজুর রহমান বাপ্পির সারা শরীর ভেঙ্গে দুমড়ে যায়। তার পরেও স্থানীয়রা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। কর্তব্যরত চিকিৎসকের আধা ঘন্টা প্রানান্তকর চেষ্টা সত্ত্বেও বাচাঁনো যায়নি মাহফুজ রহমান বাপ্পিকে। গতকাল রাতে দৌলতদিয়ার মাহফুজুর রহমান বাপ্পিদের বাড়ীতে যেয়ে দেখা যায় তার বাবা মা ও প্রতিবেশীরা তার লাশের পাশে বসে মাতম করছে। মাহফুজুর রহমান বাপ্পি আমার সাথে দুপুরে  ভাত দিয়ে  চলে আসার পর বিকালে  দোকানে না যেয়ে ও হাল খাতার কার্ড বিলি করতে যাচ্চিল । কিন্তু সে একবারও যদি আমার কাছে যেত তাহলে হইতো মরতো না। তার মা সায়েস্থা খাতুন  বিলাপ করছিল আর বলছিল  আমি কেনো  মাহফুজুর রহমান বাপ্পিকে আমার কলিজার টুকরাকে  মোটরসাইকেল কিনে  দিলাম! মোটরসাইকেল কিনে না দিলে আমার মানিক মরতো না। প্রতিবেশী এক দ্কোনদার হাউমাউ করে কেদে বললো মাহফুজুর রহমান বাপ্পির মত এতো শান্ত ছেলে  আর একটাও নেই। তার মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। বাদল মিয়া জানান, বাপ্পি  আমার একমাত্র পুত। তার বড় মেয়ে তার ছোট টাও মেয়ে। বড় মেয়েটার বিয়ে দিয়েছি। মাহফুজুর রহমান বাপ্পির বিয়ের  চিন্তা করছিলাম স্বপ্ন ছিল নিজের শরীর খারাপ মাহফুজুর রহমান বাপ্পির বিয়ে দিয়ে ব্যবসাটার কাজে  জোরেশোরে লাগিয়ে দেব কিন্তু আমার সব স্বপ্ন ভেঙে তছনছ হয়ে  গেল। চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ওসি (অপারেশন) আমির আব্বাস জানান নিহতের পরিবার কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ না করায় তার লাশের ময়না তদন্ত ছাড়ায় লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ট্রাকটি থানায় আটক রাখা আছে আর ট্রাকের হেলপার ড্রাইভার ঘটনার পালিয়ে গেছে। আজ সকাল নয়টায় মাহফুজুর রহমান বাপ্পির নামাজের যানাযা শেষে দৌলতদিয়াড় কবর স্থানে দাফন কাজ সম্পন্ন হবে তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন  অতি সরু রাস্তায় ডিভাইডার এবং রাস্তায় পিচ না থাকায় সড়ক দূর্ঘটনারও একটি অন্যতম মূল কারণ। রাস্তায় পিচ থাকলে  তার মোটর সাইকেলের  চাকা পিছলিয়ে যেত না। অনেকে এজন্য সড়ক বিভাগের গাফিলতি ও অবহেলার অভিযোগ তোলে। উল্লেখ্য শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্যস্ততম ড়ককের ৭৫ ভাগ সড়ক চলাচলের  একেবারেই অযোগ্য হলেও  কর্তৃপক্ষ  নজর দিচ্ছে না । সড়কের বেহাল দষার কারণেই  প্রায় ঘটছে ছোট বড় দীর্ঘটনা। ঝরছে তরতাজা  প্রাণ।