জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা গ্রেপ্তার

65

ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে ১৫ হাজার ৪৬০টি; হাতিয়ে নিয়েছে ৮ কোটি টাকা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ। পরীক্ষা না করেই করোনা রোগের ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। গতকাল রোববার দুপুরে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তাকে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়। পুলিশ বলছে, ডা: সাবরিনা আরিফের বিরুদ্ধে করোনা রিপোর্ট জালিয়াতিসহ নানান অভিযোগ ওঠার পর গতকাল রোববার দুপুরে তেজগাঁও ডিসি কার্যালয়ে তাকে ডেকে আনা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রিপোর্ট জালিয়াতির সাথে তার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এর আগে একই মামলায় গ্রেফতার করা হয় জেকেজির প্রধান নির্বাহী ও ডা: সাবরিনার স্বামী আরিফ চৌধুরীকে। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, তদন্তে জেকেজির প্রতারণার সঙ্গে ডা: সাবরিনা আরিফের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। পুলিশের ধারণা, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে জেকেজি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় আট কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পুলিশ জানায়, জালিয়াতির মাধ্যমে করোনার ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে জেকেজি নামক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। বিষয়টি তদন্ত করে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ডা: সাবরিনার স্বামী আরিফের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। একই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল দুপুরে ডা: সাবরিনাকে তেজগাঁও ডিসির কার্যালয়ে আসতে বলা হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে সাবরিনার সম্পৃক্ততা পাওয়ায় বেলা ৩টার দিকে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। আজ সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে।
জানা গেছে, গত ২৩ জুন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জেকেজি হেলথ কেয়ারের নার্স তানজিনা পাটোয়ারী ও তার স্বামী হুমায়ূন কবিরকে গ্রেফতার করে। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল এই প্রতিষ্ঠান থেকে করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে। গ্রেফতারের পর তানজিনা ও তার স্বামী পুলিশকে জানায়, জেকেজি হেলথ কেয়ারে তানজিনার বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। ভুয়া করোনা পরীক্ষা করে কোটি কোটি টাকা কামানো দেখে তানজিনা প্রতিষ্ঠানটির কাছে আরো বেশি বেতন দাবি করে। বিষয়টি জেকেজির কর্ণধার আরিফ চৌধুরী জেনে তানজিনা ও তার স্বামীকে চাকরিচ্যুত করে। পরে তারা দুজন বাসায় বসে নিজেরাই করোনার ভুয়া টেস্ট করে মানুষকে রিপোর্ট দেয়া শুরু করে। তানজিনা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে আনলে তার স্বামী ঘরে বসেই ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করে দিতো।
গত ২৩ জুন রাতে তানজিনা ও তার স্বামী জেকেজির বিষয়ে সব তথ্য দেয়ার পর ২৪ জুন জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে প্রতারক আরিফসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় জেকেজির কার্যালয় থেকে ল্যাপটপসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি জব্দ করে পুলিশ। এরপর তাদের দুদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীও দেন। এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় চারটি মামলা হয়েছে। এদিকে মালিককে ছাড়িয়ে নিতে জেকেজির কয়েকজন কর্মী তেজগাঁও থানার সামনে বিক্ষোভ করে। এই ঘটনায় আরো একটি মামলা দায়ের করা হয়। যে মামলায় আরো ১৮ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে প্রতারণার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ডা: সাবরিনা আরিফকে গ্রেফতার না করায় বিভিন্ন মহলে কানাকানি শুরু হয়।
পুলিশ আরো জানায়, জেকেজির প্রতিষ্ঠান থেকে জব্দকৃত ল্যাপটপ ও নথিপত্র থেকে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২৭ হাজার রোগীকে করোনা টেস্টের রিপোর্ট দিয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের করোনার নমুনা আইইডিসিআরের মাধ্যমে সঠিক পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০ রিপোর্ট পরীক্ষা না করেই প্রতিষ্ঠানটির ল্যাপটপে তৈরি করা হয়। সরকারের কাছ থেকে বিনামূল্যে নমুনা সংগ্রহের অনুমতি নেয় জেকেজি। তাদের হটলাইন নম্বরে ফোন করলে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বাসায় গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতেন। আবার অনেকে জেকেজির বুথে এসে নমুনা দিতেন। তাদের মাঠকর্মীরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, কেরানীগঞ্জ ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনা উপসর্গ দেখা দেয়া মানুষের নমুনা সংগ্রহ করত।
বিনামূল্যে করার কথা থাকলেও প্রতি রিপোর্টে ৫-১০ হাজার টাকা করে নেয়া হতো। আর বিদেশীদের কাছ থেকে নেয়া হতো ৮০ থেকে ১০০ ডলার। সেই হিসাবে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্টে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে পুলিশের ধারণা। তাদের জালিয়াতির কারণে ২৪ জুন জেকেজি হেলথ কেয়ারের নমুনা সংগ্রহের যে অনুমোদন ছিল তা বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এদিকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ও জেকেজির চেয়ারম্যান ডা: সাবরিনা গণমাধ্যমে নিজেকে জেকেজির ‘চেয়ারম্যান নয়’ বলে দাবি করেছিলেন। তিনি ওই প্রতিষ্ঠানটির ‘কোভিড-১৯ বিষয়ক পরামর্শক’ বলে দাবি করেছেন। তবে পুলিশের তদন্ত বলছে, সাবরিনাই জেকেজির চেয়ারম্যান।
বরখাস্ত হলেন সাবরিনা
এদিকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে ডা: সাবরিনা আরিফকে। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কথা জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে হৃদরোগ হাসপাতালের পরিচালক মীর জামাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ডা: সাবরিনার গ্রেফতারের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানাতে পেরেছিলাম। পরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে বরখাস্তের জন্য বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদফতর মহাপরিচালকের কাছে আবেদন করি। এরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হলো তাকে হাসপাতাল থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।