ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে সহিংসতা : আ.লীগ অফিসে হামলা, গুলি : আহত ১৭ : অছাত্রদের অংশগ্রহন স্পষ্ট

260

ডেস্ক রিপোর্ট: নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা হয়েছে রাজধানীর ঝিগাতলায়। হামলার জেরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার্কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এসময় আওয়ামী লীগের কার্যালয়েও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। দুপুর থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে চলে এ সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। সংঘর্ষের খবর ও ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মারধরের শিকার হন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। এসময় কয়েকজন ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয়। হামলা ও সংঘর্ষের মধ্যে গুজব ছড়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা।
এই গুজবকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলা ও সংঘর্ষের সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পাশে নীরব দর্শকের ভূমিকায় দেখা যায় পুলিশকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের তেমন তৎপর দেখা যায়নি। অন্যদিকে সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিজিবি সদর দপ্তরে দায়িত্বরত সদস্যরা বাইরে এসে আন্দোলনকারীদের শান্ত করার চেষ্টা চালান। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আওয়ামী লীগ পার্টি অফিসে হামলার ঘটনায় প্রশিক্ষিতরা জড়িত ছিল। যারা হামলা চালিয়েছে, তারা সাধারণ ছাত্রছাত্রী নয়, তারা রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত। হামলায় আওয়ামী লীগের ১৭ জন নেতাকর্মী আহত হন বলে ওবায়দুল কাদের জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজন ঝিগাতলা এলাকায় সড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিয়ে কাজ করছিলেন। দুপুরের দিকে একদল যুবক দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করে। এ খবর সায়েন্স ল্যাব ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীরা জানতে পেরে তারা ঐক্যবদ্ধভাবে ঝিগাতলার দিকে এগোতে থাকে। বিজিবি সদর দপ্তরের প্রধান ফটকের কাছে গেলে বিপরীত দিক থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে ছাত্রদের ধাওয়া করে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা লাঠি ও রড নিয়ে ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়। এসময় গুলিরও শব্দ শোনা যায়। সংঘর্ষ চলাকালে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও চার নারী শিক্ষার্থীকে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে নিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়েছে এমন গুজব ছড়ালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। প্রথমদিকে পুলিশ নীরব থাকলেও পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করতে দেখা যায়।
হামলার খবরে আশেপাশের সবক’টি কলেজের শিক্ষার্থীরা সিটি কলেজ এলাকায় জড়ো হতে থাকে। পরে তারাও সংঘর্ষে জড়ায়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথম দফায় হামলাকারীদের মাথায় হেলমেট ও হাতে লাঠিসোটা দেখা যায়। হামলা-সংঘর্ষে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করে। হাসপাতাল, দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয়। যানচলাচল একদম বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে বিজিবি সদস্যরা শিক্ষার্থীদের বুঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে তারা রাস্তা ছেড়ে চলে যান। এদিকে ঢাকা কলেজের সামনে মুন্সি আবদুর রউফ কলেজের একাদশ শ্রেণির একছাত্রের মাথা ফাটিয়ে দেয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে সায়েন্স ল্যাবে উত্তেজনা তৈরি হয়।
দুটি হামলার খবর স্থানীয় শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছালে তারা প্রতিরোধ গড়ে, তোলেন এবং সংঘবদ্ধ হয়ে রাস্তার পাশে থাকা ডিভাইডারের (রেলিং), রড, গাছের ডাল ও সড়কের আশেপাশে থাকা বিভিন্ন ধাতব বস্তু নিয়ে সামনে এগোতে থাকে। বিকাল সোয়া তিনটার দিকে দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় ওই এলাকায় প্রায় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের হাজারখানেক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনার পর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে পুলিশের মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ৫ সদস্য ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক সমঝোতা বৈঠক হয়। বৈঠকের পর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রায় বিশ মিনিট ধরে চলা ওই বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বের হয়ে আসেন। তারপর ওই শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পিলখানার সামনে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। হাসিবুর রহমান তূর্য্য নামের এক শিক্ষার্থী তখন বলেন, আমরা ৫ সদস্যের একটি টিম আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেছি। আমাদের চার নারী শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে নির্যাতনের যে গুজব ছড়িয়েছিল তা আসলে মিথ্যা। দুর্বৃত্তরা গুজব ছড়ানোর কারণে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছেন। আমরা তার দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। যদি খুব দ্রুত বাস্তবায়ন না হয় তবে আমরা আবার আন্দোলনে নামব।
এদিকে, বিকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার খবর পেয়ে শাহবাগে অবস্থান নেয়া শিক্ষার্থীরা বিকাল সোয়া ৩টায় আন্দোলন স্থগিত করেন। ঢাকা উদ্যান সরকারি কলেজের ছাত্র জুবায়ের হোসেন সজল সাংবাদিকদের জানান, নৌ মন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ চাই আমরা। এছাড়া, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে চালকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি পূরণ করলে রাস্তা থেকে সড়ে যাবে শিক্ষার্থীরা। সজল বলেন, সড়কে প্রতিদিন যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে সরকারকে সব মৃত্যুর দায় নিতে হবে। শুধু দু’জনের দায় নিলে চলবে না। একের পর এক দুর্ঘটনার দায়ভার সড়ক মন্ত্রণালয় এড়িয়ে যেতে পারে না বলেও তিনি জানান। শিক্ষার্থীরা জানান, রোববার (আজ) সকাল ১০টা থেকে ফের দাবি বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে অবস্থান নেবেন। এদিকে, হামলার ঘটনার প্রতিবাদে রাতে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।