চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে লকডাউনের ৮ দিন

123

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবী পরিচিতি পেয়েছিল ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এক ভাইরাসের বিস্তার সেই পরিচিতি যেন মুছে দিয়েছে। তিন মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে প্রতিটি দেশ একে-অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে সংক্রমিত দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে, বাতিল করা হচ্ছে ভিসাও। প্রতিটি দেশই নিজের সীমান্ত সুরক্ষায় জোর দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিচ্ছিন্নতা আগামী জুন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
সেই প্রভাব চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের ওপরও পড়েছে। গত ৮ দিন চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের সবকিছুই অন্যরকমভাবে চলছে। চিরচেনা শহরটাও যেন বদলে গেছে অনেকটাই। দোকানপাট থেকে শুরু করে চুয়াডাঙ্গার ইতিহাসে যা কখনোই হয়নি তাও হয়েছে। একটানা ৮ দিন জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক সময়ের সমীকরণসহ সব স্থানীয় পত্রিকা বন্ধ রেখেছিল তাঁদের প্রিন্ট ভার্সনটি। তবে চালু ছিল অনলাইন ভার্সন। প্রতিদিন সকালে উঠে পত্রিকা পড়ার মানুষগুলো হয়ত একটু স্বাদহীনভাবেই কাটিয়েছিল এই দিনগুলি। কেমন গেল, গত ৮ দিন ছাপা খবর বাদে। অনেকটাই অজানাভাবে চিরচেনা-চিরজানা এ চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর আর তার মানুষগুলোর জীবনযাত্রা। সে কথা বলার আগে, প্রিয় পাঠক, একবার বলতেই হচ্ছে খবরের কাগজে করোনাভাইরাস ছড়ায় না। বলছেন যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা। তাই নিশ্চিতে খবরের কাগজ পড়তে পারেন।
২৬ মার্চ চুয়াডাঙ্গার সবকিছু বন্ধ থাকার নিষেধাজ্ঞা জারির পর চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর শহরও পরিণত হয়েছিল নিস্তব্ধ এক শহরে। তবে এখন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও মোটামুটি স্বাভাবিক এ শহর। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে মাঠ পর্যায়ে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রশাসনের সহযোগিতা করার জন্য মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। অকারণে বাইরে না বেরিয়ে বাড়িতেই থাকতে বলছেন তারা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হলেও চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরের বেশিরভাগ এলাকাতেই এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হচ্ছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘোষিত ছুটির কয়েকদিন পার হতে না হতেই শহরের চিত্র প্রায় স্বাভাবিক সময়ের চেহারা নিয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই অকারণে বোরোচ্ছেন বাড়ির বাইরে।
এদিকে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চুয়াডাঙ্গায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার, পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম, পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তি উদ্যোগেও জেলার বিভিন্ন স্থানের অসহায়, দুস্থ ও কাজহীন মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহরের বিভিন্ন স্থানের রাস্তায় জীবাণুনাশক ওষুধ মিশ্রিত পানি ছিটানো হচ্ছে নিয়মিত। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে এ পানি ছিটাচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার শহরে জীবাণুনাশক ওষুধ মিশ্রিত পানি ছিটানোর এ বিশেষ উদ্যোগটি নেন। ভালো খবর, চুয়াডাঙ্গায় করোনা আক্রান্ত ইতালি ফেরত যুবক ১৫ দিন আইসোলেশনে থাকার পর সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে সদর হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। আবার এক মহিলা করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরীক্ষায় তাঁর শরীরে করোনা ধরা পড়েনি।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে নববর্ষের সব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের ঘোষণা করা ছুটির মেয়াদ সীমিত আকারে বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার সকালে চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে এ ঘোষণা দেন তিনি।
ঝামেলায় আছেন কৃষকেরা। রবি ফসলের ভরা মৌসুমে করোনাভাইরাসের আতঙ্কে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারছেন না চুয়াডাঙ্গার অনেক কৃষক। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনায় বড় ধরনের জনসমাগম হয়, এমন বাজার বাদে কাঁচামালের হাট-বাজার সীমিত পরিসরে খোলা থাকায় কৃষক তাঁদের উৎপাদিত রবি শস্য বিক্রিতে সমস্যায় পড়েছেন। তাঁরা বলছেন, পাইকারি ক্রেতা কম থাকায় এবং জেলার বাইরে থেকে ব্যাপারী না আসতে পারায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে আছেন।