চুয়াডাঙ্গায় শহীদ দিবসে জাতীয় পতাকার অবমাননা

293

সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ম না মেনে পতাকা উত্তোলন: উড়েছে রাতেও
সোহেল রানা:
লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের জাতীয় পতাকা। বিশ্বজুড়ে এই পতাকায়ই বাংলাদেশ পরিচিত। কিন্তু এই পতাকার মর্যাদা রক্ষায় আমাদের উদাসীনতা স্পষ্ট। জাতীয় পতাকা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও, তা প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। এতে করে ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তে কেনা জাতীয় পতাকার মর্যাদা ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে হর-হামেশা। জেনে হোক বা অজ্ঞতার কারণে হোক, জাতীয় পতাকার অবমাননা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ না থাকায়, বিশেষ দিনগুলোতে যে যার মতো করে উত্তোলন করে চলেছেন এই পতাকা।
গতকাল ভাষা শহীদদের স্মরণে, তাদের প্রতি সম্মান জানাতে সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন স্থানে খেয়াল-খুশি মতো জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। অনেক স্থানে রাতেও উড়তে দেখা গিয়েছে পতাকা। এই দিনটি কি? এই দিনে কিভাবে পতাকা উত্তোলন করতে হবে? কিভাবে নামাতে হবে? কখন নামাতে হবে? কেনো পতাকা উত্তোলন করেছে? সে সম্পর্কে ধারণা নেই অনেকের।
গতকাল বৃহস্পতিবার ছিলো ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পতাকা বিধিমালা অনুসারে এই দিন ছাড়াও ১৫ই আগষ্টসহ সরকার নির্দেশিত দিনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করে উত্তোলন করতে হবে। সকালে সূর্যোদয়ের পর মূহুর্তে জাতীয় পতাকা সোজা দন্ডায়মান বস্তুর সাথে ধীরে ধীরে পূর্ণ উত্তোলন করে ৩০ সেকেন্ড রেখে স্যালুট দিতে হবে। স্যালুট শেষ হলেই ধীরে ধীরে মাপ মতো (পতাকাটির প্রস্থের সমপরিমান) নিচে নামিয়ে বাঁধতে হবে। এর পর বিকালে সূর্যাস্তের আগমূহুর্তে পতাকাটি পূনরায় পূর্ণ উত্তোলন করে ৩০ সেকেন্ড রেখে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নামিয়ে ফেলতে হবে। স্থান ভেদে মাপ ভিন্ন হতে পারে সে ক্ষেত্রে সঠিক মাপ জেনে উত্তোলন করা বাধ্যতামূলক। রাতে জাতীয় পতাকা উত্তলিত করা যাবে না। এছাড়াও জাতীয় পতাকা যদি ব্যবহার উপযোগী না থাকে সেক্ষেত্রে পতাকাটিকে শ্রদ্ধার সাথে সমাধিস্থ করতে হবে। অনেকে এ নিয়ম জানে, আবার অনেকেই জানেনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিভিন্ন ব্যাংকসহ নানা শ্রেণীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের খোয়াল-খুশি অনুযায়ী পতাকা উত্তোলন করেছে। সেই সাথে ফাঁটা ছেড়া, মাপ ও রঙ সঠিক নয়, তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে বাকা করে গাছের সাথে, এমনকি বাড়ির গ্রিল রেলিংয়ের সাথে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের খুটির সাথে বেঁধে রেখেছে জাতীয় পতাকা।


গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা নির্বাচন অফিস, চুয়াডাঙ্গা সোনালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক দর্শনা শাখা ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত না করে পরিপূর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়াও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জেলা সঞ্চয় অফিস ও জেলা ক্রীড়া অফিসসহ চুয়াডঙ্গা জেলার বিভিন্ন স্থানে বাঁকা করে তাদের খেয়াল-খুশিমত উত্তোলন করেছে জাতীয় পতাকা। চুয়াডাঙ্গাতে যে সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সরকার নির্দেশিত নিয়মনীতি না মেনে খেয়াল-খুশিমত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন, তাদের কয়েকজনের সাথে কথা হলে, কেউ বলেন, ছুটিতে আছি বিষয়টি আমার জানা নেই। আবার কেউ বলেন, সকাল থেকে ওই দিকটাতে নজর দেওয়া হয়নি। আবার কেউ বলেন, এখনি ঠিক করে উত্তোলন করছি। তবে সাধারণ অনেক ব্যবসায়ী যারা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে বিভিন্ন ভঙ্গিতে পতাকা উত্তোলন করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই জানেন না, কি কারণে পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তাছাড়া কিভাবে পতাকা উত্তোলন করতে হবে।


বাঁকা করে পতাক উত্তোলনের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা হাসপাতাল সড়কের এক কাঠ মিস্ত্রির সাথে কথা হলে তিনি বলেন, “আজ স্বাধীনতা দিবস” এই কারণে পতাকা টাঙিয়েছি। এ ভাবে বাঁকা করে উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তার সরল জবাব, সে সঠিক নিয়ম জানে না।
নিয়ম না মেনে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে এভাবে পতাকা তোলার বিষয়ে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সাথে কথা হলে তারা বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও আজ অবদি আমরা জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি সঠিকভাবে জানতে বা শিখতে পারলামনা। এটা বড় দুঃখের বিষয়। আমাদের আর কত দিন, কত বছর লাগবে জাতীয় পতাকার সঠিক ব্যবহার শিখতে। আবার কবে শিখবো? মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য সেদিন যারা বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের ভাষাটাকে রক্ষা করেছে, বিশ্বের বুকে আমাদেরকে একটি মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে সেই অকুতভয় ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করার পূর্বে এর সঠিক ব্যবহার জানাটা অত্যন্ত জরুরি। এ সময় তারা আরও বলেন, প্রচার-প্রচারণা ছাড়াও আইনে পতাকা অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে যে ধরণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে একটু যতœশীল হলে হয়তো আমরা জাতীয় পতাকার অবমাননা করার হাত থেকে রক্ষা পাব।
মহান শহীদ দিবসে সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খেয়াল-খুশি মতো জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না জনতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস বলেন, জাতীয় পতাকার সঠিক ব্যবহারের জন্য ২১ শে ফেব্রুয়ারির পূর্বের মিটিংগুলোতে সকলকে সতর্ক করাসহ একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছিলো। তারপরও যে সকল প্রতিষ্ঠান নিয়ম না মেনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।