চুয়াডাঙ্গায় অতিবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

117

ফাল্গুনী আবেশে বদলাচ্ছে প্রকৃতি : এ যেন এক রুদ্রমূর্তি চেহারা

৩৯.৪ মি.মি বৃষ্টিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ভুট্টা-কলাসহ বিভিন্ন ফসল
এসএম শাফায়েত:
ফাল্গুনের শুরু থেকে বেশ জোর বেগে প্রকৃতি তার চেহারা বদলাতে শুরু করেছে। তবে প্রকৃতির এ চেহারা যেন এক রুদ্রমূর্তি। হঠাৎ ঝড় আর ভারী বর্ষণে রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ভুট্টা, কলাসহ বিভিন্ন ফসল। ভেঙে পড়েছে গাছপালা, ঘরবাড়ি। ঝরে গেছে আম ও লিচুর মুকুল। গতকাল বুধবার বেলা ৩টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে ভারী বৃষ্টিতে এ ধরণের ক্ষয়ক্ষতি চোখে পড়ে। এদিন জেলা আবহাওয়া অফিসের স্কেলে ৩৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। অতি ভারি এ বৃষ্টিপাতে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ধান, গম, ধনিয়া, সরিষা, মসুর ও তামাক ক্ষেতে অতিরিক্ত পানি জমেছে। ফলে দ্রুত পচনশীল এ সকল ফসল নিয়ে দুঃচিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। তবে আম ও লিচুর মুকুল ঝরে পড়ায় ফলনের ক্ষতি হবে না। সেই সঙ্গে আবাদী জমির ক্ষতিগ্রস্ত ফসল সরিয়ে ফেলে নতুন কোন আবাদে লোকসান কমবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সরেজমিনে চুয়াডাঙ্গা সদরের বেলগাছি, জাফরপুর, দীননাথপুর, গাঁড়াবাড়িয়া, মাখালডাঙ্গা, গাইদঘাট, কুকিয়াচাঁদপুর, ঠাকুরপুর, কুলচারা, সাতগাড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায় ক্ষয়ক্ষতির হালচিত্র। প্রায় প্রতিটি গ্রামেরই আধাপাকা-কাঁচা ঘর-বাড়ি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে কয়েক’শ হেক্টর জমির ভুট্টা, তামাক ও কলাগাছ। জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে মাটি ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে আলু, পেঁয়াজ ও রসুন। ঠিকমতো পরিচর্যা না হলে এ সকল ফসল পচে নষ্ট হবে। এদিকে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ধান, গম, মসুর, ধনিয়াসহ নানা শাকসবজিরও। বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় গাছ ভেঙে ও উপড়ে পড়ে বৈদ্যুতিক তার, খুটি এবং ট্রান্সফরমারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দমকা হাওয়ার সঙ্গে হঠাৎ বর্ষণে মেইন লাইন ও সরবরাহ লাইনের উপর গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় বেশ কিছু সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল গ্রাহকরা।
এরআগে (১৯ ফেব্রুয়ারি) ঝড়বৃষ্টিতে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীবননগর উপজেলার কৃষকেরা। এই এলাকায় শিলাবৃষ্টিতে মাঠের ফসল এবং কাঁচা ও আধা পাকা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের কয়া ও বেণীপুর গ্রামের মাঠের পর মাঠজুড়ে গম, মসুর, ভুট্টা, শাকসবজি ও তামাকখেত মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, গতদিনের ঝড়-বৃষ্টিতে উপজেলার ৫৫০ হেক্টর জমির মসুর, ৫৮০ হেক্টর গম, ৬০ হেক্টর ধনিয়া, ২৫০ হেক্টর আলু, ৪৫০ হেক্টর শাকসবজি, ৫০ হেক্টর পেঁয়াজ, ৭০ হেক্টর রসুন, ১০০ হেক্টর তামাক, ১৫০ হেক্টর কলা, ৪০ হেক্টর পাম ও ২০০ হেক্টর আমের ক্ষতি হয়।


জেলা সদরের সাদেক আলী মল্লিকপাড়ার আম ব্যবসায়ী আলম বলেন, ‘আম গাছে মুকুল যে পরিমাণ এসেছিল তাতে অন্যান্য বছরের লোকসান অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো; কিন্তু বসন্তের শুরুতেই ভারিবৃষ্টিতে তাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।’ আমের উৎপাদন কেমন হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।
এ প্রসঙ্গে সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবীদ তালহা জুবায়ের মাসরুর নিউটন, ‘ঝড় ও অতিবৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে এ এলাকার ভুট্টা ও কলাগাছের বেশি ক্ষতি হয়েছে। যে সকল জমির ভুট্টা ও কলাগাছ প্রায় সবই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলে জমিতে নতুন কোন ফসল আবাদ লাভজনক হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে মুগসহ বিভিন্ন শাকসবজি লাগানো যেতে পারে।’


এবার আমের উৎপাদন ভালো হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ আমের মুকুল ঝরে পড়লেও চাষিদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা, আম হলো বৈরি আবহাওয়ার ফসল। ঝড়, বৃষ্টির মধ্যেই আমের উৎপাদন হয়ে থাকে। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এবার প্রচুর মুকুল এসেছে। সব মুকুলে শেষ পর্যন্ত আম থাকে না। আবার ধরলেও গাছে থাকে না, ঝরে পড়ে। এবার অতিবৃষ্টির কারণে অনেক মুকুল ঝরলেও বৃষ্টি গাছের মুকুলগুলোর জন্য ভালো হয়েছে।’ তাই আমের কাঙ্খিত উৎপাদন পাওয়া যাবে বলেই মনে করেন এই গবেষক। তিনি আরও বলেন, ‘মাঠকর্মীরা ক্ষতির পরিমাণ ও কৃষকদের নাম লিপিবদ্ধের কাজ করে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’