চায়ের সাতকাহন

30

স্বাস্থ্য ডেস্ক
চা নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন এক চীনা কবি। চীনের তাং কবি লোটাং লিখেছেন, ‘প্রথম কাপ আমার ঠোঁট ও গলা ভেজায়, দ্বিতীয় কাপ আমার একাকিত্ব দূর করে, তৃতীয় কাপ নীরস অস্ত্রের খোঁজ করে এবং দেখে যে সেখানে অদ্ভুত ভাবনির্দেশক ৫ হাজার গ্রন্থ, চতুর্থ কাপ আমাকে ঘর্মাক্ত করে আর তাতে শরীরের সব দূষিত বস্তু লোমকূপ দিয়ে বেরিয়ে আসে, পঞ্চম কাপে আমি পবিত্র হই, ষষ্ঠ কাপ আমাকে অমরত্বে নিয়ে যায়। সপ্তম কাপ-আহা, কিন্তু আমি আর পারি না, আমি শুধু ঠান্ডা বাতাসের শ্বাস অনুভব করি যা আমার জামার ভেতর দিয়ে উঠে আসে। হোরাইসা কোথায়? আমাকে মধুর সমীরণের ওপর চড়তে দাও আর হাওয়া ও পানির ওপর দিয়ে ভাসতে।’ এখন এই আধুনিক বিশ্বে শত রকমের চা। তার খোঁজ রাখাটাও বেশ কষ্টের। নানা স্বাদের নানা গন্ধের চা। কোন চায়ের কেমন গন্ধ, কোন এলাকার চায়ের লিকার গাঢ়, কোন চায়ের দুটি পাতা ভিজিয়ে সারা দিন খাওয়া যায়। গ্রিন টি এসে তো বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে এত শত রকমের চা আছে তা সাধারণ ক্রেতাদের অগোচরেই রয়ে গেছে।
চা বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। চায়ের কচি পাতার নির্যাস সারা বিশ্বের মানুষকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছে। চা-কে বলা হয় নিষ্পাপ পানীয়, নিরাপদ পানীয় যার কোনো ক্ষতিকর দিক নেই, নেই মাদকতা। বরং আশ্চর্য এই পানীয় মানুষের মাঝে সজীবতা ছড়িয়ে দেয়। বিশ্ব জুড়ে এই চা নিয়ে যে কত্ত কত্ত তোড়জোড় চলছে। বিজ্ঞানীরা ব্যস্ত নানা জাতের উদ্ভাবনে, কোন এলাকার গাছের কেমন গন্ধ তা নিয়ে রীতিমত গবেষণা চলছে। সেই পানীয় না খেলে কারো সকালে ঘুমের চটকা ভাঙে না, কারো সারা দিন মাথা ঝিম ঝিম করে। কারো কাছে শরীর-মন সতেজ রাখার নাম চা। এখন তো চা সৌন্দর্য চর্চা, রূপ লাবণ্য ধরে রাখার জন্যেও নিয়মিত পান করছেন স্বাস্থ্য সচেতনরা।
চায়ের আবিষ্কার চীনে। এই নামটিও এসেছে চীনের উপজাতিদের ‘অময়’ ভাষার শব্দ ‘তে’ (ঃব) থেকে পরে ক্যান্টনিজ ভাষায় চা (পযধ) শব্দটির উত্পত্তি। চা শব্দটি পারস্য, পর্তুগিজ, জাপান, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ভাষায় মিশে গেছে। আমাদের উপমহাদেশেও ফরাসি ও অন্য শব্দের সঙ্গে চা শব্দটি বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে।
চায়ের আবিষ্কার
ধারণা করা হয়, চীনা দার্শনিক কনফুশিয়াসের সময় অথবা খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫০ শতাব্দীতে ব্যবহার শুরু হয় চায়ের। ৭৯৩ সালে চীনে চায়ের ওপর কর ধার্য করা হয়েছিল। ৯ম শতাব্দীতে চীন থেকে চা জাপানে পৌঁছলেও জাপানিরা ১২০৬ সালে এর চাষ শুরু করেন। চীনারা দাবি করেন যে খ্রিষ্টপূর্ব ৫ হাজার বছর আগে সম্রাট শেন নাং ঘটনাচক্রে চায়ের আবিষ্কার করেন। ‘দি হারবাল ক্যানন অব শেন নাং’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয় যে, চায়ের নির্যাসে ৭২ রকমের বিষকে নির্বিষ করার ক্ষমতা রয়েছে। এদিকে, বর্তমান সময়ে এসে চীনের ইউনান প্রদেশে প্রতœতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে প্রমাণ মিলেছে মৃত মানুষের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে চা ছিল প্রয়োজনীয় উপাদান। এমনকি কবরের ভেতরে চায়ের ডাল পাতা দেওয়া হতো। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর পরে চা ইউনান থেকে অন্য প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রাজদরবারে মদ্যপানের বদলে চা পানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।