চামড়ার দামে হতাশা, অনিশ্চয়তায় ব্যবসায়ীরা!

75

চুয়াডাঙ্গায় কোরবানির ছাগলের চামড়া ২০ টাকা আর গরুর চামড়া ১৫০ টাকা!
নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় কোরবানির ছাগলের চামড়া ২০ টাকা আর গরুর চামড়া ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এত কম দামে চামড়া বিক্রি তবুও ক্রেতার দেখা মিলছে না। নাম মাত্র দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা। চুয়াডাঙ্গা-৬ ও মহেশপুর-৫৮ বিজিবি বলছে, সীমান্তে কঠোর অবস্থানে আছে তারা, এখন পর্যন্ত পাচার হয়নি কোনো পশুর চামড়া।
চুয়াডাঙ্গায় শনিবার কোরবানির ঈদের দিন থেকে শুরু করে মঙ্গলবার ঈদের চতুর্থ দিনেও জেলার বিভিন্ন এলাকা ও মাদ্রাসা থেকে কোরাবানির চামড়া কিনেছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রপ্তানির সরকারি সিদ্ধান্তের পরও কোরবানির পশুর চামড়া সস্তা বিক্রি হতে দেখা গেছে। চামড়ার দাম কম থাকায় এতিমখানা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ নিজেরাই লবন দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করছেন বেশি দামে বিক্রির আশায়। ফলে চামড়ার আড়তগুলোতে চামড়া কম আসছে। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়ার দাম নেই, যা চামড়া কিনেছি, তা কবে নাগাত বিক্রি করতে পারব জানি না। বুঝতে পারছেন না এবার লাভ হবে না লোকশান?
জানা যায়, কোরবানির ঈদে জেলায় ৯০ হাজার থেকে এক লাখ পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল। করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ মানুষ কম কোরবানি দিয়েছেন এবার। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চামড়ার দাম একেবারেই কম। একটি ছাগলের চামড়া আকারভেদে ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর গরুর চামড়া একটি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ শ টাকা পর্যন্ত।
এদিকে, খুচরা চামড়া বিক্রেতারা বলছেন আড়তে নিয়ে চামড়া বিক্রি করলে গাড়ি ভাড়ার টাকা উঠছে না। তাই চামড়া বিক্রির জন্য না নিয়ে ফেলে দিলেই ভালো হত। এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো চামড়ার দাম ভালো না পাওয়ায় নিজেরাই লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করছে বেশি দামে বিক্রির আশায়। চামড়া নিয়ে সবাই কষ্টের মধ্যে রয়েছেন।
জেলার বিভিন্ন এলাকার মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোডিং (এতিম খানা) কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘কোরবানির ঈদে আমরা প্রচুর চামড়া পেয়ে থাকি। ওই সব চামড়া বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানের অনেক কাজ করা হয়। কিন্তু এ বছর চামড়ার দামে আমরা হতাশ। এবার ছাগলের চামড়া মাত্র ২০ টাকা, আর প্রকারভেদে ১৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে গরুর চামড়া। তাই এবারের চামড়া বিক্রি না করে নিজেরাই লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করছি বেশি দামের আশায়। যদি নির্দিষ্ট সময়ে বিক্রি করতে না পারি, তাহলে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।’
চুয়াডাঙ্গা বুজরুকগড়গড়ি দারুল উলুম মাদ্রাসায় এবার কোরবানির ঈদে সংগ্রহ হয়েছে ছাগলের চামড়া ৫৬২টি ও গরুর চামড়া ১৫০টি। এর মধ্যে ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ শ টি এবং গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০০টি। বাকি চামড়াগুলো ত্রুটিযুক্ত, ছোটো ও নিম্নমানের হওয়ায় তা চামড়া ব্যবসায়ীর নিকট প্রায় বিনামূল্যেই দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা বুজরুকগড়গড়ি দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মুফতি মুস্তফা কামাল কাসেমী বলেন, এবার চামড়ার দাম নেই। বছর দুয়েক আগেও যে চামড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন, সেই চামড়া এবার ৪৫০ টাকা দামে গড়ে বিক্রি করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের নিকট।
চুয়াডাঙ্গার বেদারগঞ্জ এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মঈন উদ্দীন বলেন, ‘চামড়ার দাম কম। এবার ঈদে আমি যে টাকার চামড়া কিনেছি, প্রায় সমান টাকার লবন দিয়ে তা প্রক্রিয়াজাত করেছি। ঢাকা এবং নাটোরের বিভিন্ন চামড়া ব্যবসায়ীরা এই চামড়া কিনে থাকেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবসায়ীর কোনো রকম সাড়া পায়নি। ছাগলের চামড়া ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে এবং গরুর চামড়া এক মাস থেকে দেড় মাসের মধ্যে বিক্রি করতে হয়। এতো দিন চামড়া রেখে দেওয়াও মুশকিল। দেশের কোথাও এবার চামড়ার দাম নেই। এবার চামড়ায় লাভের থেকে লোকশানের আশঙ্কা করছি।’
চুয়াডাঙ্গা রেলবাজারের চামড়া ব্যবসায়ী সামসুল আলম টুটুল জানান, এবার ছাগলের চামড়া একেকটি ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা এবং গরুর চামড়া একেকটি চামড়া ১৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দামে কিনেছেন তিনি। বিভিন্ন মানের চামড়ার কথা উল্লেখ করে টুটুল বলেন, লবণ ছাড়া ২৭-২৮ বর্গফুটের এক নম্বর একটা চামড়া ৬ শ টাকা করেও কিনেছেন। আর ত্রুটিযুক্ত তিন নম্বর শ্রেণির খারাপ মানের লবণ ছাড়া চামড়া ১৫০ টাকা করেও কিনেছেন। এমন চামড়া ২০ থেকে ২২ বর্গফুটের হলেও মানের কারণে দাম পাওয়া মুশকিল হয় বলে জানান টুটুল। তিনি আরও বলেন, ঈদের তিন দিনে ৩’শ টির মতো গরুর চামড়া ও ১৪ শ থেকে ১৫ শ এর মতো ছাগলের চামড়া কিনেছেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত ঢাকা বা নাটোর থেকে কোনো ক্রেতার কল পাননি। কবে নাগাত এসব চামড়া বিক্রি করতে পারবেন জানেন না। কম দামে কেনা চামড়াতেও এবার লাভ হবে না লোকশান তা বুঝতে পারছেন না এই ব্যবসায়ী।
ঝিনাইদহ মহেশপুর-৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল আহসান বলেন, ‘আমরা সীমান্তে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর অবস্থানে আছি। পশুর চামড়া যাতে পাচার না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা হচ্ছে। এবারে এখনো পর্যন্ত কোনো চামড়া পাচার বা এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
দামুড়হুদা প্রতিবেদক জানিয়েছেন:
দামুড়হুদা উপজেলায় গত বছরের তুলনায় এবার ঈদুল আজহায় অনেক কম পশু কোরবানি হয়েছে। তবে ছাগল, ভেড়া ও গরুর চামড়া অবিক্রি হওয়ায় অনেকেই মাদ্রাসায় দিয়েছে, আবার অনেকে ছাগল-ভেড়ার চামড়া ২০টাকা থেকে ৩০ টাকা ও গরুর চামড়া ১ শ থেকে ৫ শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন।
দামুড়হুদা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন, নজরুল ইসলাম, মঈন উদ্দীন ও শরিফুল ইসলাম ১২২টি গ্রাম ও একটি পৌরসভায় যাতে সঠিকভাবে এবং নির্দিষ্ট স্থানে ছাগল, ভেড়া ও গরু কোরবানি হয়, তা তদারকি করেন। এবার উপজেলায় মোট কোরবানি দেওয়া হয়েছে ছাগল-ভেড়া ১৯ হাজার ৩৯৯টি ও গরু ৩ হাজার ৯৮০টি।
চামড়া ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন জানান, ‘এবার কোরবানিতে আমাকে অনেকে ছাগলের চামড়া বিনামূল্যে দিয়েছে। তবে ছাগল-ভেড়ার চামড়া কিনেছি ২০ থেকে ৩০ টাকা করে ও গরুর চামড়া কিনেছি ২ শ থেকে ২৬০ টাকায়। বিক্রি করেছি ছাগল-ভেড়ার চামড়া ৪০ টাকা কোনোটা ৫০ টাকা এবং গরুর চামড়া বিক্রয় করেছি ২৭০ টাকা এবং বড় গরুর চামড়া ৩ শ টাকা।’
চামড়া ব্যবসায়ী দামুড়হুদার কৃত্তিক চন্দ্রদাশ জানায়, ‘চামড়ার দাম এবার কম। আমরা চামড়া কেনার পর প্রতিটি চামড়ার জন্য ১৫০ টাকার লবণ দিতে হয়। তাতে চামড়ার দাম বেড়ে যায়। তবে এবার চামড়া ব্যবসায় লোকসান হবে। লোকসান হলেও কিছু করার নেই। কারণ আমাদের ব্যবসায় এটা লাভ হলেও করতে হবে লোকসান হলেও করতে হবে।’
দামুড়হুদা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মশিউর রহমান জানান, অন্যবারের তুলনায় এবার ছাগল, ভেড়া ও গরু কোরবানি হয়েছে খুব কম। তবে যেগুলো কোরবানি হয়েছে, তা সঠিক ও নির্দিষ্ট স্থানে দেওয়া হয়েছে। এবার ছাগল, ভেড়া ও গরুর চামড়ার দাম খুব কম।
জীবননগর অফিস জানিয়েছে:
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি দিলেও চামড়ার দাম নিয়ে এবার মাথাব্যথা নেই চুয়াডাঙ্গার কোরবানিদাতাদের। চামড়ার দাম নিয়ে বিগত দুই-তিন বছরের ভোগান্তি আর বিরক্তি কাটাতে অধিকাংশ কোরবানি দাতা নিজেদের পশুর চামড়া দান করেছেন কওমি মাদ্রাসায়। তাই অন্য বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি চামড়া পেয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। এতে অনেক বেশি আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও চামড়ার দাম কম হওয়ায় হতাশ হয়েছে তারা। জেলার বিভিন্ন কোরবানিদাতা, কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, আড়তদার, মৌসুমি ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এমনই চিত্র উঠে এসেছে। এদিকে অন্যবারের তুলনায় এবারের ঈদুল আজহায় পশুর চামড়ার দাম কম হওয়ায় হতাশ জীবননগর কোরবানীর চামড়া বিক্রেতারা।
জীবননগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জীবননগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এ বছর গরু কোরবানি হয়েছে ৭৩৫টি এবং ছাগল ও ভেড়া কোরবানি হয়েছে ৭ হাজার ২৫৩টি। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর কোরবানির চামড়ার দাম কম থাকায় চামড়া বিক্রেতারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের শাখারিয়া দারুল উলুম বালক বালিকা কওমী মাদ্রাসার মুহাতামিম হাফেজ মাওলানা ইকবাল হুসাইন বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর পশুর চামড়ার দাম তুলনামুলকভাবে অনেক কম। গত বছর গরুর চামড়ার দাম ছিল ৬০০টাকা পিচ এবার তা ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দাম দিচ্ছে। গত বছর ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ৭০টাকা পিচ এ বছর দাম কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ টাকা পিচ।
জীবননগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নুর আলম বলেন, জীবননগর উপজেলায় এ বছর গরু কোরবানি হয়েছে ৭৩৫টি এবং ছাগল কোরবানি হয়েছে ৭ হাজার ২৫৩টি। তবে চামড়ার বাজারটা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। যার জন্য চামড়া বিক্রেতারা একটু দাম নিয়ে হতাশার মধ্যে আছেন।
জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুনিম লিংকন বলেন, কোরবানির ঈদে পশুর চামড়া বিক্রির জন্য সরকারিভাবে একটা দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে গরুর চামড়া প্রতিফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা, খাশি ১৩ থেকে ১৫ টাকা এবং বকরি ১০ থেকে ১২ টাকা ফুটে বিক্রয় করতে পারবে। তবে চামড়া নিয়ে যাতে কোনো ধরনের সিন্টিকেট তৈরি না হয়, সে জন্য প্রশাসিনকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মহেশপুর ৫৮-(বিজিবির) পরিচালক লে. কর্ণেল কামরুল আহসান বলেন, ‘পশুর চামড়া আমাদের দেশের একটি সম্পদ। এই সম্পদ যাতে কোনো সিন্ডিকেট অবৈধভাবে ভারতে পাচার না করতে পারে, সে জন্য বিজিবি সীমান্ত এলাকাগুলোতে কঠোর নজরদারি করছে।’