চাপে পড়বেন ভোক্তারা

90

সমীকরণ প্রতিবেদন:
নতুন বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। অথচ নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন বাস্তবায়নের কারণে নিত্যপণ্যসহ বিভিন্ন দ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবআির) ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক (এসডি) খাত থেকে ৩৭ হাজার ৫৮২ কোটি টাকার অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যার কারণে শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণে ব্যয় বাড়বে। যদিও নতুন আইন বাস্তবায়নে এনবিআরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভ্যাট খাতকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এনবিআর। রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভ্যাট থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে তারা। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন বিভিন্ন খাতে ভ্যাট ও এসডি আরোপের কারণে দাম বাড়বে। যার কারণে ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রাজস্ব কর্মকর্তারা বলেন, চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) ১ লাখ ৪ হাজার ৬ কোটি টাকা ভ্যাট সংগ্রহের সংশোধিত লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বছর শেষে ৮২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পারবে এনবিআর। ২০১৯-২০ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য তাদের অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। তারা বলছেন, নতুন আইন অনুযায়ী ভ্যাটের পরিবর্তনের কারণে লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবেন। তবে অনেক কর্মকর্তারা বলেন, নতুন ভ্যাট আইন ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করবে।
এদিকে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান দিক হলো অটোমোশন বা অনলাইন কার্যক্রম। আগামী অর্থবছর থেকে আইন কার্যকরের উদ্যোগ নিলেও এখনো এনবিআর তাদের ভ্যাট কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ অটোমোশন বা অনলাইনভিত্তিক করতে পারেনি। ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে আইন বাস্তবায়নের প্রধান মাধ্যম অটোমোশন। সেটাই এখনো কার্যকর হয়নি। তাহলে এনবিআর এই খাত থেকে কিভাবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করবে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে কাজ করবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন ভ্যাট আইন অনুযায়ী অনলাইন ভ্যাট সিস্টেম চালু করতে নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে যানা গেছে ইএফডি দেয়ার জন্য এনবিআরের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। দোকান মালিক সমিতি বলছে, তারা ৩০ লাখ মেশিনের জন্য আবেদন করলেও এনবিআর দেবে মাত্র ১০ হাজার মেশিন। যে কারণে এই পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করতে জটিল পরিস্থিতিতে পড়বে এনবিআর। যদিও অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ভ্যাট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ইএফডি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইএফডি মেশিন ক্রয়ের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে তারা এখনো প্রয়োজনীয় ইএফডি মেশিন কিনতে পারেনি। তাহলে আমরা অনলাইনে ভ্যাট দেব কিভাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আইনটি বাস্তবায়নের যে ছক প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ সরকার ব্যাপকভাবে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর কথা বলেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় এনবিআরের আওতা বাড়ানোর কাজটি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে না। নতুন ভ্যাট আইন সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, একাধিক হারে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করার ঘোষণা এসেছে বাজেটে। আগে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাতে হবে, নতুন আইনে কোন পণ্যে কত ভ্যাট হার হবে। তারপর প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সফটওয়্যার সেভাবে সাজাবে। কিন্তু এসব বিষয়ে এনবিআরের তেমন প্রস্তুতি নেই। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকর করা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ইসিআর মেশিনের বদলে ইএফডি মেশিনে ব্যবসায়ীদের কোনো আপত্তি নেই জানিয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, আমরা দেখতে চাই এনবিআর তার সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন ভ্যাট আইনটি কার্যকর করছে। ইএফডি মেশিনের সঙ্গে এনবিআরের সার্ভার সরাসরি যুক্ত থাকবে বলে ব্যবসায়ীরাও যেমন ফাঁকি দিতে পারবেন না; তেমনই অসাধু কোনো কর্মকর্তা ব্যবসায়ীদের হয়রানিও করতে পারবেন না। তবে পর্যাপ্ত মেশিন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।