গুজব শুনে গণপিটুনিতে জড়ালেই সর্বনাশ

37

‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’, দেশজুড়ে এ ধরনের গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে ইতিমধ্যে ৬ জন নিহত হয়েছে এবং অনেকে আহত হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে গণপিটুনির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এসব মামলায় ১০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রশাসন এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে। সরকারের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে এসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে। উন্নয়নের অগ্রগতি রুখতে স্বার্থান্বেষী মহল তৎপরতা চালাচ্ছে। ওইসব গুজবের ফাঁদে পা দিয়ে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। দেশজুড়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা ঘটনা ঘটলেও সম্প্রতি বাড্ডায় এক নারী গণপিটুনিতে নিহত হওয়ার পরে তোলপাড় শুরু হয়। ওই নারী তার শিশুর ভর্তির জন্য স্কুলে খোঁজ নিতে গিয়ে স্থানীয় কিছু ভ্রান্ত জনগণের হাতে নিহত হয়েছে। গণমাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। এই ঘটনায় মূল হোতাসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশজুড়ে চলা এই গুজবের শেকড়ের সন্ধানে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে বেশকিছু সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তারপরেও নতুন নতুন তথ্য সম্বলিত গুজবের উৎপত্তি থেমে নেই। এখানে একটি জিনিস লক্ষ্যনীয়- কে বা কারা গুজব ছড়াচ্ছে আর গণপিটুনিতে মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ, ঘটনায় জড়িয়ে অপরাধী হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সর্বোপরি ক্ষতি হচ্ছে কিন্তু সাধারণ মানুষেরই। এখন পর্যন্ত যে ৬ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে, তাদের কেউই ছেলেধরা ছিল না বলে পুলিশ তদন্ত করে জানিয়েছে। অথচ এই মানুষগুলো অহেতুক গুজবের শিকার হয়ে নিহত হলো আর ওই ঘৃণিত অপরাধে বোকার মতো জড়িয়ে আইনের দৃষ্টিতে অপরাধী হতে হলো শতাধিক মানুষকে। অথচ একটু সচেতন হলে কিন্তু এই অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না কাউকেই। জনগণকে আরো সচেতন করতে গুজব প্রতিরোধে আজ বৃহস্পতিবার থেকে সপ্তাহব্যাপী দেশজুড়ে ‘সচেতনতা সপ্তাহ’ পালন করা হবে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। সচেতনতা ও নিরাপত্তার অংশ হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাইকিং করা, লিফলেট বিতরণের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে খুতবায় এ বিষয়ে বয়ানও দেবেন মসজিদের ঈমামগণ। বিষয়গুলো ইতিবাচক। স্কুল-কলেজ, পাড়া-মহল্লায় অচেনা কারও আচার আচরণ ও কার্যক্রমে যদি সন্দেহ জাগে, তাহলে প্রয়োজনে তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া উচিত। সরকারের টোল ফ্রি কলসেন্টার ‘৯৯৯’ নম্বরে কল করেও তথ্য দিতে পারবে যে কেউ। এটা না করে অপরাধে জড়ালে কোনো সমাধানতো হচ্ছেই না বরং গুজবের শিকার হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও জনগণের নিরাপত্তা বিশ্বাসে এমন উদাহরণ তৈরি করতে হবে, যাতে করে তারা গণপিটুনির মতো অপরাধ না জড়িয়ে সন্দেহভাজনদের আইনের হাতে তুলে দেয়। আমাদের বিশ্বাস, বিগতদিনের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যার যার অবস্থানে থেকে সঠিক ও আইনত পদক্ষেপ নেবে।