গুজব ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়

60

বিশ্লেষকদের অভিমত ফেসবুক-ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কঠিন ভাষায় কথা বলতে হবে
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও গত ১৯ নভেম্বর হঠাৎ করেই খবর ছড়িয়ে পড়ে লবণের দাম বাড়বে। এমন খবরে ৫, ১০, ২০ কেজি পর্যন্ত লবণ কিনেছেন অনেকে। লবণ কেনার হিড়িক দেখে দোকানিরাও লুফে নিয়েছেন অধিক মুনাফা। প্রতি কেজি ৩০ টাকা মূল্যের লবণ বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। তবে কে বলেছে লবণের দাম বাড়বে, তা সঠিক করে বলতে পারেননি কোনো ক্রেতাই। সবার একটাই কথাÑ ইন্টারনেটে দেখেছি। পরে জানা গেল, লবণের দাম বাড়ার খবর পুরোটাই গুজব। শুধু লবণ নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এখন গুজবের ছড়াছড়ি। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়ানো এমন গুজব নানা অঘটনেরও জন্ম দিয়েছে। ঘটেছে প্রাণহানিও। এ বছরই পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে, এমন গুজবে প্রাণ গেছে অন্তত পাঁচজনের। ভোলায় নবী (সা.)-কে অবমাননার গুজবে ভয়াবহ সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে। এই দুই ঘটনাই ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে। কয়েক বছর আগে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে তা-ব চালিয়েছিল জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। এ ঘটনাটিও দ্রুত ছড়িয়েছিল ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ২০১২ সালে কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় এবং ২০১৭ সালে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে রংপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করেই। সম্প্রতি পিয়াজ নিয়ে ফেসবুক-ইউটিউবে ছড়ানো ট্রোল ভিডিওতে সরকারে বিরুদ্ধে উসকানিমূলক প্রচারণাও দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, সরকারের শক্ত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না থাকা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় ইন্টারনেটভিত্তিক গুজব ছড়ানোর ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। ঘটনাগুলো এখন শুধু ভার্চুয়াল জগতেই নেই, জাতীয় নিরাপত্তায়ও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনা রোধে ফেসবকু-ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে কঠিন ভাষায় কথা বলতে হবে। তারা কথা না শুনলে প্রয়োজনে ওই সাইট সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে হবে বলেও মত বিশ্লেষকদের। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করে যেসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, এর অধিকাংশই সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার উদ্দেশে। কখনো কখনো নিদৃষ্টি ব্যক্তির সুনাম ক্ষুণœ করতেও গুজব ছড়ানো হয়। ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে অপপ্রচার চালানো, ছবি বিকৃতি এবং কুৎসা রটানোর মাধ্যমে অন্যের সম্মানহানি ঘটানো যেন এখানে অতি সাধারণ ব্যাপার। ছোটখাট বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারের পাশাপাশি চলছে জঙ্গিবাদের উসকানিও। এসব ঘটনায় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পাশাপাশি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী ও শিশুরা।
যেভাবে গুজব ছড়ানো হয়:
গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ইন্টারনেটে গুজব ছড়ানোর জন্য চক্রগুলো সাধারণত ছয়টি কৌশল অবলম্বন করে। ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোনো পোস্ট দেখে তা বিশ্বাস করার আগে এই বিষয়গুলো মিলিয়ে দেখলেই পোস্টটি সঠিক না গুজব তা চিহ্নিত করা যাবে। এই ছয়টি বিষয় হচ্ছে- ছবিতে কারসাজি, বানোয়াট ভিডিও আপলোড, ভুঁইফোড় নিউজ পোর্টালে সত্যের বিকৃত উপস্থাপন, নকল ও কাল্পনিক বিশেষজ্ঞ, ভুয়া বক্তব্য প্রচার, গণমাধ্যমের অপব্যবহার এবং তথ্য বিকৃতি।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা :
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আইন যেমন শক্ত না, যেটুকু আছে তারও যথাযথ ব্যবহার হতে দেখছি না। তাই সাইবার অপরাধ বা ইন্টারনেটে নানা ধরনের গুজব সৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। ব্যক্তিগত কুৎসা রটানোর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারকে নানা ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে একটি গ্রুপ ফেসবুকে সক্রিয় আছে। তিনি আরও বলেন, দেশের সামাজিক অপরাধ রোধ করতে হলে ফেসবুক-ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কঠিন ভাষায় কথা বলতে হবে। তারা সহযোগিতা না করলে প্রয়োজনে ফেসবুক এ দেশে বন্ধ করে দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মাদ আলী শিকদার বলেন, বর্তমানে সাইবার ক্রাইম এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, যা এখন শুধু সাইবার জগতেই নেই, জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি হিসেবেও দাঁড়িয়েছে। ইন্টারনেটে নানা ধরনের গুজব অপপ্রচার ছড়িয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে নানা ধরনের দুর্ঘটনা, সংঘাত এমনকি হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। তাই সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে হবে।
শনাক্ত করা কঠিন- পুলিশ:
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, যারা গুজব সৃষ্টি করে, তারা নানা ধরনের ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে কাজ করে। এজন্য তাদের শনাক্ত করা কঠিন। এর পরও আমরা অনেককে শনাক্ত করে গ্রেফতার করেছি। এ ছাড়া গুজব প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পুলিশ কাজ করে বলেও জানান তিনি।