গুজব গুলিয়ে দিচ্ছে সব

64

জাতি হিসেবে বাঙালিকে বলা হয় হুজুগে। কোনো বিষয় ও অবস্থা সম্পর্কে এদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার অক্ষমতা ঐতিহাসিক। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের কাছে পরাজিত হলো। যুদ্ধের পর নৌকাযোগে পালায়নরত নবাব নাজিমপুরে বন্দী হলেন। বন্দী নবাবকে কোম্পানির সৈন্যরা মুর্শিদাবাদে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ঐ সময় রাস্তার দুপাশে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছিল। তারা নবাবকে কীভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, এ তামাশা দেখতে এসেছিল। বলা হয়, যত লোক নবাবকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, তারা যদি সবাই একত্রিত হয়ে একটা করে মাটির ঢিলও ছুড়ত, তাতেই তারা নবাবকে ছাড়িয়ে নিতে পারত।
বাঙালি তা না করে নবাবকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেছে। রোজ রোজ তো আর নবাব দর্শন হয় না। নবাবকে ধরে নিয়ে যাক, তাতে আমার কী? আমি তো নবাবকে দেখতে পেলাম। নিজের অতি তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ ও চাওয়া পূরণের ইচ্ছা বাঙালি পরিত্যাগ করতে পারে না। নবাবের সময় মীরজাফর, রায়দূর্লভ, ইয়ার লতিফ, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ প্রমুখের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে দেশের স্বার্থ পরাজিত হয়েছে। এদের চক্রান্তে ভারতবর্ষের পরাধীনতা শুরু এবং ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে দেশের স্বার্থ আজও প্রতিদিন পরাজিত হচ্ছে আমাদের স্বাধীন বাংলায় তথা বাংলাদেশে।
সে সময় মীরজাফরদের ষড়যন্ত্র উৎসুক জনতা যেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে, আজও তাই করছে। তবে পার্থক্য একটা এসেছে। এখন জনতা তামাশা দেখার সাথে সাথে ঘটনার ভিডিও ধারণ করছে। ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আহ্বান করছে, এটাকে ভাইরাল করুন। এ ঘটনার বিচার হতেই হবে! ভাইরাল করুন! সভ্য সমাজের মানুষের সামনে সংঘটিত হওয়া অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা প্রতিহত করার সব কটি প্রত্যক্ষ হাত আজ স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বন্দী।
সম্প্রতি বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আমরা দেখলাম, ঘটনার সময় অনেক যুবক সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন তরুনকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করল। কেউ রিফাতকে বাঁচাতে এগিয়ে এল না। রিফাতের স্ত্রী মিন্নি একাই শেষ পর্যন্ত প্রাণপণে চেষ্টা করেছে স্বামীকে বাঁচাতে। কিন্তু পারিনি।
এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় উঠল। এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি! যেখানে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা, মানুষ কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে! এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এরা তাদেরই বংশধর, যারা নবাবকে কোম্পানির সৈন্যদের ধরে নিয়ে যেতে দেখেছে। মীরজাফরেরাও আমাদের সমাজে প্রকাশ্য দাপটের সাথেই আছে। দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তে এদের নতুন হাতিয়ার মাদক। যুবসমাজের হাতে মাদক ধরিয়ে দিয়ে এরা নয়ন বন্ড তৈরি করছে ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করছে।
রিফাত হত্যার এখনকার ঘটনা প্রবাহে আমাদের বর্তমান সমাজের আসল রূপ বেরিয়ে আসছে। বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ড নিহত। তার মানে নয়নকে যে বা যারা নয়ন বন্ড বানিয়েছিল, তাদের সম্পর্কে আপনি আর কখনো জানতে পারবেন না। কুপানোর ঘটনার ভিডিও লক্ষ করলে দেখা যাবে, কালো শার্ট পরিহিত রিফাত ফরাজী সবচেয়ে বেশি কোপ মেরেছে। রিফাত ফরাজীর জন্য বন্দুকযুদ্ধের বিধান হয়নি। শোনা যায়, তার নাকি নাতিকোটা আছে। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা মিন্নি ফেঁসে গেছে।
মিন্নির ভবিষ্যৎ পরিণতি যাতে সমাজে কোনো প্রভাব না ফেলে সে জন্য প্রথম আলোর মতো পত্রিকাগুলো রিফাত হত্যার নিউজ করার সময় মিন্নির নাম সুকৌশলে শুধু আয়শা সিদ্দিকা লিখছে। মিন্নি নামটা আপনার হয়তো অনেক দিন মনে থাকবে, কিন্তু আয়শা সিদ্দিকাকে আপনার ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তখন আলোচিত এই হত্যাকা-ের চূড়ান্ত রায় হবে। নয়ন বন্ড তৈরির কারিগরদের নিয়ে তখন আপনি চিন্তাও করবেন না।
সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করছে এখন। মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন সবার আগে তাকে যেকোনো ঘটনার ফুটেজ দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে ফিল্টার করা কোনো কিছু মানুষ আর গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। কিছু দিন আগে মাদক নির্মূল অভিযানে বিনা বিচারে অনেকের প্রাণ গেল। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনের জিজ্ঞাসা, সাংসদ আবদুর রহমান ওরফে বদির কিছু হয়েছে? ক্ষমতাবানদের এদেশে কোনো বিচার হবে না, চলমান ঘটনাপ্রবাহ মানুষের মনে এ বিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে। দেশে বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো ভোগান্তি তো আছেই।
ফলে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা লাগবে, এ গুজব এখন ডেঙ্গু জ্বরের চেয়েও আতঙ্কের নাম। মাথা লাগার গুজব কীভাবে ছড়াল? এর ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ পুলিশ যা বলেছে, পদ্মা সেতুতে কর্মরত একজন চাইনিজ বলেছিলেন, ‘উই নিড মোর হেডস’, যার বাংলা অর্থ হলো আমাদের কাজের জন্য আরও লোক দরকার। এখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এরপর দেশে ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ছেলেধরার আতঙ্ক আমাদের দেশে আগেও ছিল। বেশি দুষ্টুমি করলে ছেলেধরা ধরে নিয়ে যাবে, এ ভয় ছোটবেলায় আমাদেরও দেখানো হয়েছে। ছেলেধরায় ধরবে, এ আতঙ্কে আমি নিজেও আতঙ্কিত থাকতাম। আমাদের বাবা-মা কি এমনি এমনিই আমাদের এ ভয় দেখিয়েছে? এর পেছনে কি কোনো কারণ নেই? প্রতিটি ঘটনার আগে ও পরে অনেক ঘটনা থাকে ও ঘটে। দেশে গুজব কি একদিনেই তৈরি হলো?
মধ্যপ্রাচ্যে উঠের জকি হিসেবে রোবট ব্যবহারের আগে জকি হিসেবে ছোট শিশুদের ব্যবহার করা হতো। যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও সুদান থেকে পাচার হয়ে যেত। এখনো প্রতিনিয়ত আমাদের দেশ থেকে নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। যেসব নারীরা পাচার হয়ে যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশের স্থান হচ্ছে পতিতালয় নামক নরকে।
নিকট অতীতের কয়েকটা গুজবের কথা বিবেচনায় নেওয়া যাক। টাক মানুষের ও কালো বিড়ালের মাথায় ম্যাগনেট অর্থাৎ চম্বুক আছে। এ চম্বুকের অনেক দাম। ব্রিটিশরা মাঠে যে ম্যাগনেট পুতে রেখেছে, তার দাম কোটি টাকা। হুতম পেঁচার অনেক দাম। কয়েক লক্ষ টাকা। দেড় শ গ্রামের একটা ‘হাঁস পা’ তক্ষকের দাম হাজার কোটি টাকা। বায়ার নিজে হেলিকপ্টারে চড়ে এসে কিনে নিয়ে যাবে। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার আশায় অনেকে মাঠে নেমে পড়ল নিরীহ প্রাণী শিকারে।
কোটি টাকার আশায় দেশের কৃষিজমিতে ব্রিটিশ আমলে পুতে রাখা বজ্র বিদ্যুৎ শোষণ যন্ত্রগুলো রাতারাতি পাচার হয়ে গেল। এখন বৃষ্টিতে মাঠে কাজ করার সময় প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষকেরা বজ্রাঘাতে মারা যাচ্ছেন। পাচার রোধে দেশে দেখার কেউ নেই। প্রতিবছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
তক্ষক ও হুতুম পেঁচার অতিমূল্য গুজবে প্রতারণার নগ্ন প্রকাশ ঘটেছিল। টার্গেট ক্রেতা তক্ষক বা পেঁচা কেনার পর, সে সেগুলো আর বিক্রি করতে পারেনি। ফলে সর্বশেষ ক্রেতা লোকশানের মুখে পড়েছে। দেশের শেয়ারবাজারেও একই কায়দায় টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে। কদিন আগে শেয়ারবাজার থেকে সাতাশ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে নেদারল্যান্ডে ‘টিউলিপ মেনিয়া’র সময়ও একইভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে লোকজনকে ঠকানো হয়েছে।
বাংলাদেশে সবাই কোটিপতি হতে চায়। এটা একটা সাধারণ প্রবণতা। কোটিপতি হওয়ার জন্য যে সাধনা ও পরিশ্রম দরকার, তা কেউ করতে চায় না। সবাই বড়লোক হওয়ার জন্য মোটামুটি একটা শর্টকাট পন্থা খোঁজে । ফলে এদেশে প্রতরণা করা ও গুজব ছড়ানো সহজ। শুধু বললেই হলো, এটার দাম কোটি টাকা। কোনো কিছু বিবেচনা না করেই কান নিয়ে গেল চিলে ঘটনার মতো সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে।
এ সুযোগে ঘোলা জলের মাছ শিকারীরা মাছ শিকার করে নেবে। চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রসা ও এতিমখানার ছাত্র আবির হুসাইনের মাথাবিহীন লাশ আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। গুজব নিয়ে শত প্রচারণার মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটল? আবির হত্যা ঘটনা সম্পর্কে আমরা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এ পর্যন্ত যা জানতে পেরেছি তা হলো, উক্ত মাদ্রাসার সুপার বা মুহতামিম আবু হানিফ শিশুটিকে দীর্ঘদিন ধরে বলাৎকার করছিলেন। তাঁর এ অপরাধ যাতে প্রকাশ না পায়, সেজন্য গুজবের সুযোগ নিয়ে তিনি শিশুটিকে গলাকেটে হত্যা করেছেন। নেত্রকোনায় শিশু সজিব মিয়ার সাথেও একই রকম ঘটনা ঘটেছে। সেখানে খুনি রবিন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে।
গুজব শুধু খারাপ মানুষই ছড়ায় না, ভালো মানুষদেরও গুজব ছড়ানোর পুরোনো ইতিহাস আছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরী নবম ঘোষণা দিলেন, কালো বিড়াল শয়তানের দূত হিসেবে পৃথিবীতে আসে। ফলে লক্ষ লক্ষ কালো বিড়ালকে হত্যা ও পুড়িয়ে মারা হলো। ওই সময় ইউরোপের অনেক অংশে কালো বিড়াল বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, কোনো সমাজেই গুজবের কারণে নিরীহ কালো বিড়াল বা মানুষ হত্যার বিচার হয় না।
মাথা লাগার গুজব, বিদ্যুৎ না থাকার গুজব, শেয়ার দিলে নিশ্চিত তিনটি সুখবর পাবেন-এমন অসংখ্য গুজব আমাদের মাথাকে গুলিয়ে দিচ্ছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে তা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। দেশে চলমান ঘটনা প্রবাহে নিরীহ মানুষই গণপিটুনির শিকার হচ্ছে বেশি। ঢাকায় বাচ্চার স্কুলে ভর্তির খবর নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন রানু নামের এক মা। রানুকে সাপের মতো পিটিয়ে মারার ভিডিও আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। ঘটনার সময় বানুর অসহায় চাহনি আমাদেরও অসহায় করে দিয়েছে। বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে আমরা কত অসহায়ভাবে বেঁচে আছি, রানু তাঁর না বলা অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গিয়েছেন।
মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও জীবনধারণের সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। কোনো দেশের সরকারই এ দায় এড়াতে পারে না। আমাদের দেশের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। চলমান গুজব নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় গুজবের কারখানা।’ তাহলে বিষয়টা দাঁড়াল, ওনারা সব ধোয়া তুলসীপাতা। যত দোষ নন্দ ঘোষ। অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অবহেলার সংস্কৃতি আমাদের দেশে অবশ্য নতুন নয়। এ সুযোগে প্রকৃত অপরাধীরা এদেশে সব সময় অধরাই থেকে যায়।