গল্পটা মোটেই মিথ্যা নয়

604

আহমেদ চঞ্চল
শেষ ভরসা ছিল ফজর আলী মাওলানা, কিন্তু তিনিও সবাইকে নিরাশ করলেন। ইতিমধ্যে সরকারি দালানের গোল বারান্দায় শুইয়ে রাখা দীনু মিয়ার লাশ থেকে দূর্গন্ধ বের হতে শুরু করেছে। এ পাড়ার সবার পরিচিত, পরোপকারী দিনু মিয়া গতকাল সকালে হঠাৎ করেই দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। গতকালই দীনু মিয়া আগে যে বাড়িতে থাকতো সে বাড়ির লোকজন যথারীতি তার দাফন-কাফনের বন্দোবস্ত করতে যাবে এমন সময় কে বা কারা যেন আবিষ্কার করে, দীনু মিয়ার সুন্নতে খতনা দেয়া নেই, সে মুসলমান নয়। এ কথায় সে কথায় বেধে যায় বিপত্তি। কোন হুজুরই আর তার জানাজা পড়াতে চায়না। আজ থেকে বহু দিন আগে দেশ স্বাধীনের বছরে দীনু মিয়া এই মফস্বল শহরের পুরাতন পাড়ায় এসে ইসকান্দর আলির বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল। ইসকান্দর আলি তাকে বড়ই ভালোবাসতেন, অত্যান্ত স্নেহ করতেন। বছর পাঁচেক আগে ইসকান্দর আলি মারা গেলে কী এক আজানা কারণে দীনু মিয়া ঐ বাড়ি থেকে বের হয়ে সরকারি পরিত্যক্ত একটা ঘরে বসবাস শুরু করেন। পূব পাড়ার মসজিদের পেশ ইমাম ফজর আলি মাওলানার সাথে দীনু মিয়ার খুব সখ্যতা ছিল। ঐ মসজিদের যাবতীয় ফাই-ফরমায়েশ খাটতেন দীনু মিয়া। মসজিদ যখন কাঁচা ছিল তখন দীনু মিয়াই পয় পরিস্কার করতো। শুক্রবারে মসজিদের চারিদিকে ঝাড়ু দিয়ে একেবারে ঝকঝকে তকতকে করে ফেলতো। এমনিতে আশে পাশের যে কোন মানুষ যখন চরম বিপদে পড়তো তখন তাদের শেষ ভরসা ছিল এই দীনু মিয়া। এই তো গত ভাদ্র মাসের কথা এ পাড়ার সিরাজ মিয়ার একমাত্র ছেলে নদীতে ডুবে মারা গেল। হাজার খুঁজেও ছেলেটার লাশ আর পাওয়া যায়না। অবশেষ রাত অবধি নদীতে সাঁতরিয়ে-সাঁতরিয়ে দীনু মিয়া সেই লাশ নিয়ে সিরাজের ঘরে ফিরেছিল। গ্রামে যে বছর ভয়াবহ বন্যা গেল, ফারাক্কা বাধ খুলে দেবার কারণে, এক মিনিটে শহর যখন তলিয়ে গেল, সেই সময় ঐ দীনু মিয়া একাই নৌকা তৈরি করে সবার জান-মাল রক্ষা করেছিল। এমন কোন কাজ নেই যে লোকটা পারতো না। আকাশ সমান নারিকেল গাছ সেখান থেকে চোখের পলকে নারিকেল পেড়ে আনতো, এক মিনিটে একটা ঝাড়ু বানিয়ে ফেলতো, বোল বলতে গাছ কেটে খড়ি করে ফেলতো, শত বছরের জঞ্জালপূরণ জায়গা নিমিষেই পরিষ্কার বানিয়ে ফেলতো এই সদ্য লাশ হয়ে যাওয়া দীনু মিয়া। গ্রামের সবার আশা ছিল ফজর আলী মাওলানা এসে নিশ্চয় একটা সমাধান দিয়ে দিবেন। কিন্তু মাওলানা সাহেব যা বল্লেন তাতে সবাই আরো বেশি ধন্দে পড়ে গেল। মাওলানা, পুরোহিত, রাজনীতিবিদ, খেলোযাড় একে একে সমস্ত পেশার মানুষ দীনু মিয়ার লাশ দেখতে এলো, কিন্তু কেউ কোন সমাধানে পৌছাতে পারলোনা ।
ধীরে ধীরে রাত গভীর হতে লাগলো । দীনু মিয়ার লাশ তখনো সরকারি বারান্দায় পড়ে আছে । সবাই যে যার ঘরে নিশ্চিত মনে ঘুমাচ্ছে। রাতের মৌনতা ভেদ করে সেখানে উপস্থিত হয় কোম্পানির সুইপার কানাই লাল শীল। সে আশে পাশে তাকিয়ে নেয়। তারপর কি মনে করে যেন রাস্তার উপর চরম ঘৃণা ভরে থুথু ফেলে। আপাতত সে থুথু পৌরসভার সদ্য নির্মিত চকচকে সড়কের উপরে গিয়ে পড়ে। তারপর দীনু মিয়ার লাশটা সে তার নিজের কাধে তুলে নেয়। মনে পড়ে নয় বছর আগের এক ঘটনা। কানাইয়ের মেয়ে মালতি মেটে জন্ডিসে যখন মরতে বসেছিল তখন এই দীনু মিয়া তাকে কবিরাজের ঔষধ খাইয়ে বাঁচিয়ে তুলেছিল। কানাই এর দু’চোখ বেয়ে জল পড়তে থাকে আর বির বির করে বলে ‘দীনু ভাই হামাকে ক্ষমা করে দিও, তোমাকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে”। সুনশান নিরবতা ভেদ করে শহরের মূল সড়ক ধরে হন হন করে দীনু মিয়ার লাশ কাধে করে ছুটে চলে সুইপার কানাই লাল শীল, কাল ভোরে খিদে পেলেও যে হোটেল থেকে একটা পরোটা কিনে খেতে পারবেনা, কারণ: এ মাস থেকে মিটিং করে হরিজন সম্প্রদায়ের কাছে পরোটা বিক্রি নিষেধ করে দিয়েছে এ শহরের বণিক সমিতি ।