খালেদা জিয়ার কারামুক্তি নিয়ে নানামুখী আলোচনা

139

সমীকরণ প্রতিবেদন:
কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় না প্যারোলে?-এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানামুখী আলোচনা। বেগম জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে দলটির নেতা-কর্মীরা। এ নিয়ে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনের কথাও বলছে দলটি। তবে নানা আইনি জটিলতায় মুক্তি মিলছে না সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর। আইনিভাবে খালেদা জিয়ার কারামুক্তিতে এখন অন্তত চার মামলায় জামিন পেতে হবে। অন্যদিকে বিএনপিপ্রধানের প্যারোলে মুক্তির গুঞ্জন রয়েছে। কিন্তু তাকে প্যারোলে মুক্তি পেতে হলে সরকারের নির্বাহী আদেশ লাগবে। এ জন্য তাকে আবেদন করতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্যারোলে মুক্তিতে সম্মত নন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তিনি বেরিয়ে আসতে চান। দলের ভিতরে-বাইরে তুমুল আলোচনা থাকলেও বেগম জিয়ার পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখনো সম্মতি দেননি। দলের আইনজীবী নেতাদের আইনিভাবে লড়াইয়েরই দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা বেগম জিয়ার আইনি প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্তি চাই। তবে তিনি এখন খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা যদি তার চিকিৎসার স্বার্থে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সুপারিশ করেন, তখনই প্যারোলে মুক্তির প্রশ্ন আসবে। চিকিৎসকরা এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো কথা বলেননি।’
খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে থাকা মোট ৩৬ মামলার মধ্যে সাজা হয়েছে দুটিতে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালত পাঁচ বছর কারাদ- দেওয়ার পর হাই কোর্টে সাজা বেড়ে হয় ১০ বছর। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে ৭ বছর কারাদ- দিয়েছে নিম্ন আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন তার আইনজীবীরা। বাকি ৩৪ মামলার মধ্যে গ্যাটকো, নাইকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলাসহ ১৩টি মামলা বিচারাধীন। আর হাই কোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে ২১ মামলা। বর্তমানে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ধর্মীয় উসকানি এবং মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তির মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ান জারি রয়েছে। সর্বশেষ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে পেট্র্রলবোমা ছুড়ে আটজনকে হত্যার মামলায় গতকাল বেগম জিয়াকে দেওয়া হাই কোর্টের জামিন আদেশ বহাল রাখে আপিল বিভাগ।
জানা যায়, বেগম জিয়ার পরিবারের সদস্যরা চান যে কোনো পরিস্থিতিতে বেগম জিয়ার মুক্তি। তারা বেগম জিয়ার কাছেও প্যারোলের আবেদনের বিষয়টি তুলে ধরেন। কিন্তু বিএনপিপ্রধান তাতে সায় দেননি। আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মুক্তি পেতে দলের আইনজীবী নেতাদের প্রতি নির্দেশনা দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে পরিবারের সদস্যরা কথা বলতে রাজি হননি। বিএনপির চেয়ারপারসনের মুক্তি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, খালেদা জিয়া যদি প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করেন, তাহলে বিষয়টি চিন্তাভাবনা করে জানানো হবে।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, বেগম জিয়ার মুক্তি পেতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলনে যাবে বিএনপি। এ জন্যই দল গোছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৪০টি জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তারেক রহমান। দল গোছানোর পাশাপাশি নিজের মায়ের মুক্তি আন্দোলন নিয়েও কথা বলছেন তিনি। আগামী তিন মাসের মধ্যেই দল ও অঙ্গ সংগঠনগুলো গুছিয়ে তুলতে চান তারেক রহমান। বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে। ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটিও শিগগিরই দেওয়া হবে। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়েও কাজ চলছে। কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দল, ড্যাব ও এ্যাবের আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে। মহিলা দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিও ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরের অসম্পূর্ণ কমিটিও দেওয়া হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘দল গুছিয়েই আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে যাব। তার নেতৃত্বেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায় করব।’
প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন কিনা : খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি বিষয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, প্যারোলের বিষয়টি রাজনৈতিক। এখানে ম্যাডাম খালেদা জিয়া প্যারোলে যাবেন কিনা এবং সরকার প্যারোল দেবে কিনা এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমরা আইনজীবী হিসেবে বলতে পারি চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।’ প্যারোলের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে, ভারতে, পাকিস্তানে প্যারোলে যাওয়ার নজির আছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্যারোলে যাওয়া প্রায় দেখা যায়। আমরা চাই তাকে আইনগতভাবে মুক্তি দেওয়া হোক। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন দুর্নীতির মামলায় দ-িত হওয়ায় খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির সুযোগ নেই। তাকে আদালতের মাধ্যমেই মুক্তি পেতে হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া তো রাজনৈতিক বন্দী নন যে নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। তিনি দুর্নীতির মামলায় দ-িত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাকে মুক্তি পেতে হলে আদালতের মাধ্যমেই পেতে হবে। তিনি আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তার শারীরিক অবস্থা ও বিস্তারিত বিষয় উল্লেখ করে আদালতে আবেদন করতে পারেন। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবে তা-ই চূড়ান্ত হবে। রাজনৈতিকভাবে এখানে কোনো কিছু করার সুযোগ দেখছেন না এই সাবেক আইনমন্ত্রী।
প্যারোল সংক্রান্ত নীতিমালায় যা আছে : সাজাপ্রাপ্ত কোনো আসামিকে নজরদারিতে রেখেই শর্তসাপেক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লোকালয়ে মুক্তভাবে চলাফেরার সুযোগ দেওয়াকেই এক কথায় প্যারোলে মুক্তি বলা যায়। ২০১৬ সালে সরকারের প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালায় কারাবন্দীদের মুক্তির পথ বলে দেওয়া রয়েছে। এই নীতিমালার ১ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ভিআইপি/অন্যান্য সকল শ্রেণির কয়েদি/হাজতি বন্দীর নিকট আত্মীয় যেমন- বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। ১ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ভিআইপি/অন্যান্য সকল শ্রেণির কয়েদি/হাজতি বন্দীর নিকট আত্মীয়র মৃত্যু ছাড়াও কোনো আদালতের আদেশ কিংবা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্যারোলে মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্দীকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। উভয় ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও দূরত্ব বিবেচনায় প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ সময় নির্ধারণ করে দেবেন। নীতিমালার ২ ধারায় বলা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক পুলিশ প্রহরাধীন রাখতে হবে। নীতিমালার ৩ ধারায় বলা হয়েছে, মুক্তির সময়সীমা কোনো অবস্থাতেই ১২ ঘণ্টার অধিক হবে না। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার মুক্তির সময়সীমা হ্রাস/বৃদ্ধি করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করবে।