কোরবানির চামড়ার দামে বিপর্যয়

24

ফের বঞ্চিত গরিবরা
গত বছরের মতো এবারো কোরবানির চামড়ার দামে বিপর্যয় ঠেকানো গেল না। এতে করে দেশের দরিদ্র গোষ্ঠী তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। আমাদের দেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী, কোরবানির চামড়ার বিক্রীত অর্থের একটি অংশ তাদের দান করা হয়। এ ছাড়া দান করা হয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফলে দাম না পাওয়ায় ওই সব দরিদ্র, এতিমখানা ও কওমি মাদরাসাগুলো আর্থিক সঙ্কটে পড়বে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থের বড় একটা জোগান আসে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। দাম কম হওয়ায় এবারো ক্ষতির মুখে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। যদিও বাংলাদেশের চামড়া শিল্প এখন ২৮ ভাগ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির শিকার। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়েট ব্লু রফতানির অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সময়মতো না দেয়ায় এর ফল কোরবানির কাঁচা চামড়ায় পাওয়া যায়নি।
সরকার অন্যবারের চেয়ে চামড়ার দাম ২০-২৯ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করলেও ২০ শতাংশ কাঁচা চামড়া বিক্রি হয়নি। অথচ কোরবানির সময়ই দেশে চাহিদার ৬০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ করা হয়। বড় আকারের গরুর চামড়া গড়ে ৩৫-৪০ বর্গফুট, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া গড়ে ২৫-৩০ এবং ছোট আকারের গরুর চামড়া গড়ে ১৬-২০ বর্গফুটের হয়। তাতে সরকারের নির্ধারিত দাম হিসাব করলে বড় চামড়া কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা, মাঝারি চামড়া হাজার টাকা ও ছোট চামড়ার দাম হয় কমপক্ষে ৬০০ টাকা। তার থেকে প্রক্রিয়াজাত, শ্রমিকের মজুরি ও আড়তদারের মুনাফা বাদ দিলেও যা দাঁড়ায় এর কাছাকাছি দামেও চামড়া বিক্রি হয়নি। প্রতিটি গরুর চামড়া সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম ছিল ২০-১০ টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তাদের সাথে বৈঠক করে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা ধরা হয়। রাজধানীর বাইরে ধরা হয় প্রতি বর্গফুট ২৮ থেকে ৩২ টাকা। এ ছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া গত বছরের প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৩ থেকে ১৫ টাকা করা হয়। দরপতন ঠেকাতে ২৯ জুলাই কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়া হয়।
গত বছর ঈদের দিন রাজধানীতে ছোট গরুর একেকটি চামড়া ৩০০-৪০০ টাকা, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ৫০০-৬০০ এবং বড় চামড়া হাজার টাকায় বিক্রি হয়। পরদিন দর আরো কমলে ১৫০-২০০ টাকায় বিক্রি হয়। ঢাকার বাইরে কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে চামড়া সড়কে ফেলে দেয়া ও পুঁতে দেয়ার ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত বছর বাংলাদেশে সব মিলিয়ে এক কোটি ১৫ লাখ গরু, ছাগল, মহিষ কোরবানি হয়েছে। এবার তার চেয়ে ৩৫-৪০ ভাগ কম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার একটি কারণ হলোÑ ট্যানারি মালিকদের কাছে ১৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে আড়তদারদের। তারা অর্থসঙ্কটে থাকায় এবার তেমন চামড়া কিনতে পারেননি। আর ট্যানারি মালিকরা বলছেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে তারা আর্থিক সঙ্কটে আছেন। সেজন্য আড়তদারদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না অনেকে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে বর্তমানে চামড়ার চাহিদা কম হওয়া, গত বছরের ৬০ শতাংশ অর্থাৎ ৭০০ কোটি টাকার চামড়া অবিক্রীত থাকা এবং ফেব্রুয়ারি থেকে রফতানি বন্ধ থাকায় বিপাকে রয়েছেন তারা। তাই এবার কোরবানির চামড়ার দাম এমন কম হয়েছে। তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে চামড়ার দর আরো কমে যাওয়ার সঙ্গত কারণ নেই। করোনার কারণে অনেকের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় চলতি বছর গতবারের চেয়ে কোরবানি কম হয়েছে। ফলে চামড়ার দামে এমন বিপর্যয় হওয়ার কথা নয়। চামড়ার দামে এবারো বিপর্যয়ের কারণ সরকারি সিদ্ধান্ত। সরকার দাম কমানোয় আড়তদাররা আরো কমিয়ে দিয়েছেন।