কাশ্মীর দখল করে মুসলিমমুক্ত করাই বিজেপির লক্ষ্য

23

অবশেষে কাশ্মীরে শেষ পেরেক ঠুকেই দিল ভারত। গত ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামা হামলায় ৪৫ জনের বেশি আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ভারতের জন্য ‘ইজ্জত কা সওয়াল ’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কাশ্মীর। বর্তমান ভারতের দুই মহাশক্তিমান নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহর ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটেছিল তাতে। তিতি বিরক্ত মোদি তাই পদক্ষেপটা নিয়েই নিলেন। কাশ্মীর দখল করে নিয়েছেন তিনি। হঠাৎ করে করা কিছু নয় এটা, হিসেব করেই নেয়া। এমনিতেই তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল যে কাশ্মীরের ৩৭০ বিধি রাখা হবে না। অনুকূল পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোদি। এখন তা কার্যকর করলেন।
কাশ্মীরের গত ৭২ বছরের ইতিহাস ভারত-পাকিস্তান একাধিক যুদ্ধের ইতিহাস। তারপর ১৯৮৯ সাল থেকে স্বাধীনতার জন্য শুরু ৩০ বছরের সশস্ত্র লড়াইয়ে রক্তের নদী বয়ে গেছে। বলা হয়, এক লাখের মত মানুষ এ সময়ে প্রাণ দিয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দশ হাজারেরও বেশি নারী। হাজার হাজার কিশোর-তরুণ ছররা গুলিতে অন্ধ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। লাখ লাখ মানুষ আহত হয়ে অকেজো, পঙ্গু ও বোঝায় পরিণত হয়েছেন। তবে সে কাহিনী বলার জন্য এ লেখা নয়। এ লেখার প্রেক্ষাপট ২০১৯ সালের আগস্ট মাসের চূড়ান্ত ঘটনা প্রবাহ। ৫ আগস্ট, ২০১৯। এটি কাশ্মীরের ইতিহাসের চির অন্ধকারের দিন, সর্বশেষ টিকে থাকা সামান্য ম্বাধীন সত্তাটুকু চিরকালের মত বিলুপ্ত হয়ে একদা স্বাধীন রাজ্যের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়ার দিন। ভারতের হিন্দুত্ববাদী, ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী, ভারত থেকে মুসলিম বিলোপের নীলনকশা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিল করে দিয়ে এদিন কাশ্মীর দখল সম্পন্ন করেছে ।
সারা বিশ্ব কাশ্মীরের এই ঐতিহাসিক মৃত্যু যেন নীরবে চেয়ে দেখেছে। একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। বিশ্ব মুসলিম সংগঠন ওআইসি প্রথমে কিছু বলেনি। তবে পরে একটি নাম মাত্র বিবৃতি দিয়েছে। মুসলিম বিশে^র ধর্মীয় নেতা সউদী আরব যে বিবৃতি দিয়েছে তা দেয়া হয়েছে অনেকটা ভারতকে সন্তুষ্ট করতে। আর সংয়ুক্ত আরব আমিরাত ভারতের কাশ্মীর দখলকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে। এই ডিজিটাল যুগে কোনো মুসলিম দেশ আরেকটি মুসলিম অঞ্চলকে গ্রাস করতে যে কোনো অমুসলিম দেশকে সমর্থন করতে পারে, তার প্রমাণ দিল দেশটি। আর মুসলিমরাই যে মুসলিমদের বড় শত্রু, তার প্রমাণও নতুন করে দিয়েছে এ দেশটি।
পাকিস্তানের চাপাচাপিতে চীনের অনুরোধে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ১৬ আগস্ট এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়। পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এটি ছিল কাশ্মীর বিষয়ে প্রথম বৈঠক। যেমনটি আশা করা হয়েছিল,বৈঠকের ফল ঠিক তেমনটিই হয়েছে। বাকি চার বিশ^ শক্তির কেউ কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি। বৈঠকের কোনো বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। কাশ্মীর সংকট নিয়ে কোনো জরুরি বৈঠকের প্রয়োজন কেউ মনে করেনি। চীন নিজেও নয়। তাই আর কোনো বৈঠক হবে না।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত যতটা পরিচিত, তার যত প্রভাব রয়েছে, পাকিস্তানের তা নেই। অব্যাহত সন্ত্রাসের শিকার দেশটির অর্থনীতি শেষ হয়ে গেছে। ইমরান খানের আমলে কোনো রকমে অস্তিত্ব রক্ষা করে আছে পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একদা ভারতের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দেশটি এখন গুরুত্ব হারানোর পর্যায়ে। আফগান তালিবানের সাথে চুক্তির জন্য তারা পাকিস্তানের সাথে এখনো খানিকটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন মনে করছে। চুক্তি হয়ে গেলে হয়ত সম্পর্ক নূন্যতম পর্যায়ে নিয়ে যাবে তারা। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চিরবৈরী ভারত বিশে^র পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পন্ন একটি দেশকে যেভাবে তার দীর্ঘকালের মিত্রদের কাছ থেকে সরিয়ে ফেলে কোণঠাসা করে ফেলেছে তা বিস্ময়করই বটে। অন্যদিকে পাকিস্তান যা হারাচ্ছে তার কানাকড়িও আর ফিরে পাচ্ছে না বলেই দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের এ অসহায়ত্ব সে দেশের জনগণের জন্য যত বেদনাদায়ক , কাশ্মীরীদের জন্যও তা বটে। কারণ শক্তিশালী একটি পাকিস্তানের অবস্থান কাশ্মীরীদের জন্য সুবিধাজনক হত।
একজন মুসলিম হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আমার বুক ফেটে যায় যখন দেখি ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতের বিজেপি নেতারা কাশ্মীরী মেয়েদের বিয়ে করার জন্য সবাইকে আহবান জানাচ্ছে। কাশ্মীরী মেয়েরা যেন বেওয়ারিশ জিনিস, তাদেরকে যে খুশি সেই ভোগের জন্য নিয়ে আসতে পারে। তারা মানুষ নয়। তাদের কোনো অধিকার নেই। তারা কি মুসলমান নয়? একজন মুসলিম নারী কি কোনো বিধর্মীকে বিয়ে করে? কিন্তু কাশ্মীরী নারীদের সে মত প্রকাশ বা নিজেদের কথা বলার অধিকার বিজেপি স্বীকার করেনা বলে মনে হচ্ছে।