কাশ্মিরের বিভক্তি ও বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার

34

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির উপমহাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংকট হয়ে আছে। দেশ বিভাগের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ৩টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে কাশ্মিরকে ঘিরে। মূলত শত শত বছর ধরে কাশ্মিরের উপর মুঘল, বৃটিশ ও শিখদের দখলদারিত্ব ঘটলেও দখলদারদের সাথে কাশ্মিরিদের আপসহীন মনোভাবের কারণেই অন্য রাজ্যগুলোর চেয়ে কাশ্মির বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করে আসছে। বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন সব সময় সক্রিয় থাকলেও এই বিশেষ মর্যাদার কারণেই সাধারণ কাশ্মিরি এবং রাজনৈতিক নেতারা ভারতের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে চরমপন্থা অবলম্বন করা থেকে বিরত থেকেছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার মাধ্যমে ভারতীয় আইনের বাইরে রেখে কাশ্মিরের এই মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছিল। অবশেষে ভারতের বিজেপি সরকার কর্তৃক লোকসভায় ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রস্তাব পাস করিয়ে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদাই শুধু নয়, কাশ্মিরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুতি অংশকে কেন্দ্রিয় শাসনের অধীনে এনে কাশ্মিরিদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ৫ লাখ হিন্দু জনসংখ্যা অধ্যুতি জম্মুকে আলাদা রাজ্যের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে। এ সিদ্ধান্ত থেকে বিজেপি সরকারের হিন্দুত্ববাদি সাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় আন্তর্জাতিক মহলের কাছেও স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। জনমত ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে পাশ কাটিয়ে কাশ্মিরের বিভক্তি ও বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ভারতীয় এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে পুরো কাশ্মির উপত্যকা এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আলামত দেখা দিয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরেই কাশ্মিরের আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছিল। এমনিতেই লাখ লাখ ভারতীয় সৈন্য সমাবেশের কারণে কাশ্মিরে সব সময়ই এক প্রকার যুদ্ধাবস্থা জিইয়ে রাখা হয়। গত কয়েকদিনে সাবেক দুই মূখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিসহ বিজেপি সরকার বিরোধি সব রাজনৈতিক নেতাসহ হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বন্দি করার পাশাপাশি সেখানে সান্ধ্য আইন জারি করে একটি ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক ভারত কাশ্মিরে সামরিক জান্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। শতকরা ৯৭ শতাংশ কাশ্মিরি মুসলমানের রাজনৈতিক অধিকার সামরিক বুটের তলায় দলিত করে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে সেখানে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করতে তারা একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। কাশ্মিরের স্বাতন্ত্র্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নে সাত দশক আগে জাতিসংঘের রেজুলেশন পাস হওয়ার কারণে বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপ একই সঙ্গে ভারতীয় সংবিধান ও আন্তর্জাতিক কনভেনশনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবেই প্রতিয়মান হচ্ছে। এটা পরিষ্কার যে কাশ্মিরিরা ভারতের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে না। কাশ্মিরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্ন ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ও উত্তেজনার অন্যতম অনুঘটক। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল এবং বিভক্তির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সম্ভাব্য সবকিছু নিয়ে কাশ্মিরিদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ থেকে কাশ্মির নিয়ে পারমানবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশি দেশের মধ্যে আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জম্মু কাশ্মির ও লাদাখ অঞ্চল নিয়ে গঠিত কাশ্মির উপত্যকা আপন বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও বিশেষত্বে সমুজ্জ্বল। এখানকার মোট জনসংখ্যার বেশিরভাগ মুসলমান হলেও জম্মু এলাকায় হিন্দু প্রাধান্য এবং লাদাখে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি পুরো কাশ্মির জুড়ে হিন্দু মন্দির এবং মুসলমানদের মসজিদ-মাজার ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ে হাজার বছরের বৈচিত্র্যময় উত্তরাধিকার ও সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এই স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য কোনো চাপিয়ে দেয়া আইনের বলে রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়। একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কাশ্মিরের মর্যাদা বাতিল করার মূল লক্ষ্য হচ্ছে, সেখানে হিন্দুদের সংখ্যা বাড়িয়ে মুসলিম-প্রাধান্য বদলে ফেলা। ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ইসরাইল রাষ্ট্রের সম্প্রসারণের মত। গত ৭০ বছরেও কাশ্মিরকে আত্মীকরণ করতে পারেনি ভারত। একদিকে ভারত সরকারের জবরদস্তিমূলক নীতি অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রভাবকে এর জন্য দায়ী করা যায়।
দেশভাগের পর কাশ্মির প্রশ্নে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধ বিরতিতে জাতিসংঘের অমিমাংসিত ভূমিকার কারণে কাশ্মির শুধুই ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়, একই সাথে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যু। সেই সাথে ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও মত দিচ্ছেন কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্ত ভারতের উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আদালতের বাইরে এটি নিঃসন্দেহে একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইস্যু। গত ৭০ বছর ধরে মুসলিম বিশ্বে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির একটি অন্যতম আলোচ্য বিষয়। ৫ আগস্ট ভারতের লোকসভায় কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও কাশ্মিরে নতুন করে হাজার হাজার ভারতীয় সেনা মোতায়েনের পেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সাথে জরুরী বৈঠক করেছেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের নেতাদের সাথেও মত বিনিময় করেছেন এবং ওআইসির জরুরী বৈঠক আহ্বান করেছেন। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরেন্দ মোদির প্রস্তাবের কথা জানিয়ে কাশ্মির ইস্যুতে মধ্যস্থতা করতে নিজের সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিমত করা হলেও ইতিমধ্যে চীন, রাশিয়া, তুরস্কসহ বিশ্ব নেতাবৃন্দ ট্রাম্পের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক সংকট হিসেবে কাশ্মির ইস্যুর শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানই সকলের কাঙ্খিত। আমরা কোনো যুদ্ধ বা উত্তেজনা দেখতে চাই না। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা ফিরিয়ে দেয়ার প্রশ্ন নয়, কাশ্মিরের শাসন ক্ষমতা কাশ্মিরিদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। অস্ত্রের জোরে কাশ্মিরি মুসলমানদের দাবিয়ে রাখার পথ ভারত সরকারকে পরিহার করতে হবে।