কালীগঞ্জে বুড়ি ভৈরব নদ দখল করে পুকুর তৈরি, গতিপথ পরিবর্তন

200

প্রতিবেদক, ঝিনাইদহ:
সরকার যখন ঐতিহ্যবাহী নদ-নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে খননকাজ করছেন, ঠিক তখন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বুড়ি ভৈরব নদীর মাঝে এলাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রায় ২ একর ৩৫ শতক নদী দখল করে তৈরি করেছেন বড় একটি পুকুর। এতে নদী খননের মূল উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্তসহ পাল্টে গেছে নদী খননের ম্যাপ।
অভিযোগ উঠেছে, সিদ্দিকুর রহমান নামের এক ব্যক্তি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও নদী খননকাজের ঠিকাদারের ম্যানেজারকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে এই কাজ করেছেন। তবে সিদ্দিকুর রহমানের দাবি, তাঁর পুকুর নিজস্ব জমিতেই রয়েছে। স্থানীয় দুই গ্রাম মাসলিয়া ও হাসিলবাগের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সিদ্দিকুর রহমান প্রভাবশালী হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড এই পুকুর এলাকায় নদী খনন না করেই পাশে খনন শুরু করেছে। এ ঘটনায় মাসলিয়া গ্রামবাসীর পক্ষে আব্দুল জান্নান নামের এক ব্যক্তি পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা ভুমি অফিসে অভিযোগ দায়ের করেছেন। নদীর মধ্যে থেকে পুকুর উচ্ছেদের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছেন গ্রামবাসী।
লিখিত অভিযোগে জানা যায়, কালীগঞ্জ উপজেলার কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়ন ও বারবাজার ইউনিয়নের মাঝ দিয়ে বুড়ি ভৈরব নদ প্রবাহিত। এই নদটিতে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে খননকাজ শুরু করছে। কিন্তু নদীর মধ্যে সিদ্দিকুর রহমান মাসলিয়া মৌজা ১৫৯, বর্তমানে ১৪৫ মৌজার ১০৩ নং খতিয়ান, দাগ নং ৫৯ এলাকায় নদীর জমিতে প্রায় ২ দশমিক ৩৫ শতক জমি দখল করে পুকুর তৈরি করেছেন। বর্তমানে নদে খননকাজ চললেও ঠিকাদারের ম্যানেজার ও পানি উন্নয়নবোর্ডের যোগসাজশে সিদ্দিকুর রহমান এ পুকুরটি বানিয়েছেন বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ। তাঁর পুকুর এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড অল্প খনন করে নদীর পথ বা ম্যাপকেই পরিবর্তন করে দিয়েছে। পাশে অনেক বেশি খনন করা হলেও সেখানে খনন করা হয়নি। ইতিমধ্যে ওই জমির পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড গাছ লাগিয়ে গেছে।
মাসলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নদীর জায়গা দখল করে সিদ্দিকুর রহমান পুকুর তৈরি করেছেন। বিষয়টি অভিযোগ আকারে পানি উন্নয়ন বোর্ডে ও ঠিকাদারকে জানানো হলেও তাঁরা কোনো কর্ণপাত করেননি।
লিখিত অভিযোগকারী আব্দুল জান্নান জানান, ‘আমাদের ব্যক্তিগত জমির মধ্যে দিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার নদী খনন করলেও সিদ্দিকুর রহমানের পুকুরের পাড় তারা বেঁধে দিয়েছে। আমরা গ্রামবাসী বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছি।’ হাসিলবাগ গ্রামের আবু বক্কার জানান, তাঁদের প্রায় ৩৫ শতক ফসলি জমি নদীর মধ্যে খনন করে নিয়েছে। কিন্তু পাশে সিদ্দিকুরের প্রায় ২ দশমিক ৩৫ একর জমি পানি উন্নয়ন বোর্ড হাত দেয়নি।
মাসলিয়া গ্রামের লাভলু রহমান জানান, ‘বুড়ি ভৈরব নদের মধ্যেই এই পুকুর তৈরি করেছেন সিদ্দিকুর রহমান। আমরা চাই, পুরো নদ খনন করে নদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হোক।’ তিনি অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারের ম্যানেজার ও কিছু কর্মকর্তাদের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে এই স্থানে নদী দখল করে পুকুর করা হয়েছে। ওই পুকুরেও খননের দাবি জানান তিনি।
অভিযুক্ত সিদ্দিকুর রহমান জানান, তিনি নিজের জমিতে এই পুকুর করেছেন। নদীর পাশের জমিতে তাঁর পুকুর। তাঁর জমির পাশ দিয়ে নদীর ম্যাপে বাঁকা আছে। তিনি বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আমি বিষয়টি জানিয়েছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা আমার পুকুরের পাশ থেকে কিছু অংশ খনন করে মাটি আমার পুকুরপাড়ে দিয়েছে। আমি পরে শ্রমিক নিয়ে এই পুকুর পাড় বেঁধে নিয়েছি।’ সিদ্দিকুর রহমান জানান, ‘গ্রামের কিছু ব্যক্তি আমার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারের ম্যানেজার ইউনুচ আলী জানান, ‘আমরা নদীর ম্যাপ অনুযায়ী খনন করেছি। খননকাজ এখন চলছে। কারও কাছ থেকে টাকাও নিইনি। যে পুকুরের কথা বলা হচ্ছে, ওই পুকুরের মালিক আমাদের কাগজপত্র দেখিয়েছেন।’
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবর্ণা রানী সাহা জানান, ‘আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।