কাগজ দেখে চালভর্তি ট্রাক ছেড়ে দিল পুলিশ, গাংনীতে গুঞ্জন!

143

গাংনী উপজেলার সরকারি প্রকল্পের চাল জীবননগরে উদ্ধার, রহস্য উন্মোচন হলেও দানা বেধেছে সন্দেহ
জীবননগর অফিস:
জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়ীয়ার দেহাটির পিয়াস ফিলিং স্টেশনের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া এক ট্রাক সরকারি চাল রিপিয়ারিংয়ের (পালিশ) কাগজে দেখিয়ে খালাশ করে নেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে ট্রাকভর্তি চাল পাচার কিংবা বিক্রি করার জন্য নয়, এটি রিপিয়ারিং (পালিশ) করার জন্য রাইস মিলে নেওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন জীবননগর বাজারের বিশিষ্ট চাল ব্যবসায়ী দেহাটি গ্রামের শেখ আসাদুজ্জামান আকুল মিয়া।
জানা যায়, গত মঙ্গলবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম জাহিদের নির্দেশে জীবননগর উপজেলার কেডিকে ইউনিয়নের দেহাটি গ্রামে অভিযান চালায় চুয়াডাঙ্গা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় দেহাটি পিয়াস ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে সরকারি চালভর্তি একটি ট্রাক (চুয়াডাঙ্গা-ট-১১০৭১৮) আটক করে পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ট্রাকের চালক ও হেলপার গাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পরে ট্রাকটি তল্লাশি করে ট্রাকভর্তি সরকারি চাল উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া প্রতিটি চালের বস্তায় লেখা আছে খাদ্য অধিদপ্তরের জন্য উৎপাদন। তবে রাতে উদ্ধার হওয়া সরকারি এ চালের মালিকের সন্ধান না পেলেও গতকাল বুধবার সকালে বেরিয়ে আসে আসল তথ্য। উদ্ধার হওয়া এ চালের মালিক মেহেরপুর জেলার গাংনীর বিশিষ্ট চাল ব্যবসায়ী ও যুবলীগের নেতা মজিরুল ইসলাম। তিনি ট্রাকভর্তি এ চাল রিপিয়ারিং (পালিশ) করার জন্য রাতের আধারে জীবননগর উপজেলার দেহাটি গ্রামের আকুল মিয়ার রাইস মিলে দিয়েছিলেন।
এদিকে, রাতের আধারে পিয়াস ফিলিং স্টেশনের সামনে ট্রাকভর্তি সরকারি চাল উদ্ধার হওয়ায় এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কেউ বলছেন গাড়ি যেহেতু আকুল মিয়ার, চালের মালিকও হয়ত আকুল মিয়া। যেহেতু এখন চালের দাম বেশি এবং তিনি একজন মিলার, তাই নিজে বাঁচার জন্য তিনি এ নাটকটি সাজিয়েছেন।
এ বিষয়ে পিয়াস ফিলিং স্টেশনের মালিক শেখ আসাদুজ্জামান আকুল মিয়ার সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে পুলিশ ট্রাকভর্তি যে চালগুলো আটক করেছিল। সেগুলো কোনো অবৈধ চাল নয়, এটি আমার মিলে রিপিয়ারিং মানে পালিশ করার জন্য রাতে নিয়ে এসেছিল। ভুল তথ্যের জন্য ডিবি পুলিশ এ চালভর্তি ট্রাক আটক করে চুয়াডাঙ্গাতে নিয়ে যায়। বুধবার সকালে চালের সব কাগজপত্র দেখালে পুলিশ ট্রাকভর্তি চাল ছেড়ে দেয়।
এ বিষয়ে জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দেহাটি গ্রামে ট্রাকভর্তি সরকারি চাল ডিবি পুলিশ আটক করেছিল, বিষয়টি আমি শুনেছি। রাতেই তারা চুয়াডাঙ্গাতে নিয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়ে থানায় তেমন কোনো তথ্য নেই।’
এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা জেলা গোয়ন্দো শাখা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন অর রশিদ জানান, ‘মঙ্গলবার রাতে জীবননগর দেহাটি পিয়াস ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে ট্রাকভর্তি সরকারি চাল উদ্ধার করা হয়। বুধবার সকালে পিয়াস ফিলিং স্টেশনের মালিক আসাদুজ্জামান আকুল মিয়া দাবি করেন চালগুলো রিপিয়ারিংয়ের জন্য তাঁর মিলে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে এ চালের মালিকপক্ষ বৈধ কাগজপত্র দেখালে চালভর্তি ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে গাংনীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাংনীর বিশিষ্ট চাল ব্যবসায়ী ও যুবলীগ নেতা মজিরুল ইসলাম প্রকল্পের সভাপতিদেরকে কাছ থেকে কম দামে চাল এসব চাল কিনে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি এই চালের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও জানা গেছে। ফলে পিআইসিরা তার কাছে চাল বিক্রি করে থাকেন। যার জন্য প্রকল্পের কাজগুলো অনেক সময় মানহীন হয়ে পড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গাংনীর পিআইও অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচির আওতায় (কাবিখা) গাংনী উপজেলা পরিষদের অনুকূলে ১০ প্রকল্পের অধীনে ৬৮.৯৪৫৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ খালেক প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। সে মতো ১০টি প্রকল্পের এইচবিবি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই বরাদ্দের যারা পিআইসি ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে চাল ব্যবসায়ী মজিরুল ইসলাম কম মূল্যে চাল কিনে বেশি দামে চুয়াডাঙ্গায় বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে চাল ব্যবসায়ী মজিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি চাল ক্রয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। এ চাল বানিয়াপুকুরের আব্বাস আলীর।’
গাংনী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ খালেক বলেন, ‘কাবিখা প্রকল্পের চাল বিক্রি করা যায়। যারা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তারা চাল বিক্রি করেছে। যেটা নিয়মের মধ্যে। পিআইসি যারা, তারা এবং ক্রেতারা এটা বুঝবে। আমরা কাজ বুঝে পেলে সব মিটে গেল।’
এদিকে, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর দেহাটিতে পুলিশের চালের ট্রাক আটক এবং ছেড়ে দেওয়া নিয়ে গাংনীতে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ট্রাকভর্তি এ চাল ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জীবননগর উপজেলার কয়েকজন চাতাল মিল ব্যবসায়ী আছেন। যাঁরা বিভিন্ন স্থান থেকে টিআর কাবিখার চাল অল্প দামে ক্রয় করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।