কাঁঠালের গুরুত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে

29

চুয়াডাঙ্গায় জাতীয় ফল কাঁঠাল খাওয়া প্রতিযোগিতায় অতিথিরা
মেহেরাব্বিন সানভী:
কাঁঠাল শুধু আমাদের জাতীয় ফলই নয়, খুবই পুষ্টিকর, ভেষজগুণ সমৃদ্ধ, সুলভ ও উপকারী ফল। এর কা-, শাখা, পাতা, শেকড় কোনো কিছুই বাদ দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা কাঁঠাল খেতে আগ্রহী নয়, বরং তাদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাহিদা না থাকায় মূল্য হ্রাস পাচ্ছে, ফলে কাঁঠাল গাছ উজাড় হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের এ জাতীয় ফল কাঁঠাল। যখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গত ৩ মৌসুমে ৫৫ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ কমেছে, ঠিক সে সময়ই দ্বিতীয়বারের মতো এ কাঁঠালকে নিয়ে এক ভিন্ন রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা জেলা সংসদ। উদীচী চুয়াডাঙ্গার আয়োজনে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রশাসন, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা ও তারাদেবী ফাউন্ডেশন চুয়াডাঙ্গার সহযোগিতায় গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতীয় ফল কাঁঠাল খাওয়া ও রেসিপি প্রতিযোগিতা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যক্ষ মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘কাঁঠাল শুধু সুস্বাদু খাদ্যই না, আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতিরও অংশ। যাঁরা ব্যবসায়ী আছেন, তাঁরা পশ্চিমা দেশগুলোর মতো কাঁঠাল নিয়ে নানা রকম ব্যবসা করতে পারেন।’ উদীচীর এ ধরনের আয়োজনকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, উদীচীর এ ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন কাঁঠালের যে পুষ্টিগুণ আছে, মানুষের মধ্যে তার সঠিক ধারণা দিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এ সময় তিনি আরও বলেন, চুয়াডাঙ্গায় জাতীয় ফল কাঁঠালের চাষ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এভাবে হ্রাস পেতে থাকলে কাঁঠালগাছ বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ হ্রাসের ফলে দেশ অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খোন্দকার ফরহাদ আহমদ বলেন, ‘কাঁঠাল কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থায় খাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। কাঁঠাল পাকলে কোষ খাওয়া হয়। এ কোষ নিংড়ে রস বের করেও খাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাওয়ার ধরণ পরিবর্তন করা দরকার। কাঁঠালে আছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা আমাদের দেহকে ক্ষতিকর ফ্রির‌্যাডিকেলস থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়াও সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।’
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) কানাই লাল সরকার বলেন, থাইল্যান্ডে কাঁঠালের চিপস তৈরি করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে কাঁঠাল জনপ্রিয় করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুকিয়ে সংরক্ষণের পাশাপাশি স্যুপ, চিপস, রস (জুস), আইসক্রিম ইত্যাদি খাবার তৈরিতেও কাঁঠাল ব্যবহার করা হচ্ছে। এ উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল আমাদের মধ্যে থেকে যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি ডা. মসিউর রহমান বলেন, কোলস্টেরলমুক্ত এ ফলে নেই কোনো ক্ষতিকারক চর্বি। এতে রয়েছে প্রচুর ক্যালরি, ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন, সোডিয়াম, জিঙ্ক, নায়াসিনসহ বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান। অন্যদিকে কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন থাকায় তা মানবদেহের জন্য বিশেষ উপকারী।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক সফিকুল ইসলাম বলেন, কাঁঠালে বিদ্যমান ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস আলসার, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ ও বার্ধক্য প্রতিরোধে সক্ষম। বদহজম রোধ করে কাঁঠাল। উদীচীর এ ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠানের শুরুতেই উদীচী শিল্পীরা যে সঙ্গীত পরিবেশন করেন, তা অসাধারণ। কাঁঠালের সমস্ত পুষ্টিগুণের কথাই আছে গানগুলোর ভিতর। উদীচীর এ আয়োজন নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় ফল কাঁঠাল খাওয়ার উপকারিতাকে তুলে ধরছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি বিল্লাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন উদীচী চুয়াডাঙ্গার সাধারণ সম্পাদক হাবিবি জহির রায়হান। জাতীয় ফল কাঁঠাল খাওয়া ও রেসিপি প্রতিযোগিতার সদস্যসচিব অধিকারকর্মী মেহেরাব্বিন সানভীর উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিজ, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের সাবেক সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, সহকারী অধ্যাপক মহসিন কবির, জাতীয় ফল কাঁঠাল উৎসব ও ভক্ষণ প্রতিযোগিতার আহ্বায়ক ফরিদ আহমদ।
অনুষ্ঠানে উদীচীর শিল্পীরা জাতীয় ফল কাঁঠালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে তৈরি গান, কাঁঠাল কথন, কবিতা পঠন, লোকগান ও কাঁঠাল রঙ্গ পরিবেশন করেন। কাঁঠাল ভক্ষণ প্রতিযোগিতায় মাত্র ২ মিনিটে ৬৭টি কোয়া খেয়ে ১ম স্থান অধিকার করেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র পারভেজ। একই সময়ে ৬১টি কোয়া খেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন জয়রামপুরের খোদাবক্স আলি, ৫৯টি কোয়া খেয়ে যৌথভাবে ৩য় স্থান অধিকার করেছেন আলমগীর ও সোহেল। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীসহ সংখ্যার দিক থেকে প্রথম দশজনকে তারাদেবী ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারে প্রত্যেকের জন্য ছিল বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ পোশাক একটি করে লুঙ্গি, গেঞ্জি ও গামছা।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন উদীচী চুয়াডাঙ্গার সাবেক সহসভাপতি ডা. লুৎফর রহমান, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ চুয়াডাঙ্গা জেলার সাধারণ সম্পাদক কাজল মাহমুদ, উদীচীর সম্পাদকম-লীর সদস্য মিলন কুমার অধিকারী, শাহেদ জামাল, সাইফুল ইসলাম, কাসেব রহমান, নাজমুল ইসলাম, মামুন অর রশিদ জয় প্রমুখ।