কর্মহীন ৬৬ শতাংশ মানুষ

75

বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় ৭৪ শতাংশ মানুষের উপার্জন কমেছে
সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারিতে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ মানুষ তাদের কর্ম হারিয়েছেন। আর গ্রামাঞ্চলের ৪১ শতাংশ মানুষ তাদের কর্ম হারিয়েছেন। শহরাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ কর্মহীন হয়েছে ঢাকায়। ঢাকা শহরের ৭৪ শতাংশ মানুষ কর্ম হারিয়েছেন। আর গ্রামাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়েছে বরিশাল বিভাগ, ৪৭ শতাংশ। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংক ‘লুজিং লাইভলিহুডস : দ্য লেবার মার্কেট ইম্প্যাক্টস অব কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেছে। কর্মক্ষেত্রে করোনার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানার জন্য গত ১০ জুন থেকে ১০ জুলাই ফোনকলের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার জরিপের ফলাফলও বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে করোনা কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দরিদ্র এলাকা এবং কক্সবাজার জেলাকে।
ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ কর্মহীন হয়েছে ঢাকায়। এখানে ৭৪ শতাংশ মানুষে তাদের চাকরি হারিয়েছেন। ঢাকা বিভাগের গ্রামাঞ্চলের ৪৫ শতাংশ মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছেন এই করোনায়। গ্রামাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়েছে বরিশাল বিভাগে। এখানে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ৪৭ শতাংশ মানুষ। আর এই বিভাগের শহর এলাকার ৫৪ ভাগ চাকরি হারিয়েছেন। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বরিশাল বিভাগের শহরের ৫৪ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৪৭ শতাংশ; চট্টগ্রাম বিভাগের শহরের ৬৩ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ; ঢাকা বিভাগের শহরের ৭৪ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৪৫ শতাংশ; খুলনা বিভাগের শহরের ৫৯ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৩৯ শতাংশ; রাজশাহী বিভাগের শহরের ৬১ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৩৫ শতাংশ; রংপুর বিভাগের শহরের ৫৮ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৩৭ শতাংশ এবং সিলেট বিভাগের শহরের ৬৬ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৩৯ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়েছেন করোনায়। যদিও শুধু বিশ্বব্যাংকের গবেষণাই নয়; অন্যান্য গবেষণায়ও উঠে এসেছে করোনায় মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়া দিনমজুরদের চিত্র।
সূত্র মতে, করোনা মহামারিতে আর্থিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়েছেন দেশের ১০ কোটিরও বেশি মানুষ। আর, তাদের পরিবারের উপার্জন কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ। এই অবস্থা আরো করুন দিন আনে দিন খায় মানুষের জন্য। বর্তমানে দিনমজুরের কিছু কাজ শুরু হলেও, পারিশ্রমিক কমেছে অনেক। মোহাম্মদ ইসমাইল ১৭ বছর ধরে কাজ করেন রাজধানী ঢাকায়। জামালপুরে ৩ সন্তানের সংসার চলে এই আয়ে। এত বছরে কাজের এমন অভাবে পড়তে হয়নি ইসমাইলকে। এদিকে, মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ঢাকার মধ্যেই আমুলিয়া মডেল টাউনে ২৮ হাজার টাকা চুক্তিতে এক সপ্তাহের মধ্যে মাটি ভরাটের কাজ নিয়েছেন বাধ্য হয়ে। কারণ এই কাজে আগে পেতেন ৩৫ হাজার টাকা। খাটাতে হচ্ছে ১৭ জন শ্রমিককে, এখন জনপ্রতি তাদের হাতে দিতে পারছেন ৫শ’ টাকা করে। অথচ, এই কাজেই করোনার আগে পারিশ্রমিক ছিল দিনে ৮শ’ টাকা। একাধিক দিনমজুরদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আগে অনেক কাজ ছিলো এখন আর নেই। আরেকজন বলেন, যা টাকা পাই তাতে নিজের থাকা খাওয়া হয় না বাড়িতে পাঠাতে পারি না। তাদের মতে, শহর কি গ্রাম দৈনিক আয় কমেছে প্রান্তিক মানুষের।
সূত্র মতে, ২০১৯ সালে যেখানে সরকারি হিসেবে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, এই সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৪১ শতাংশ হবার আশঙ্কা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর। আরেক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে করোনা মহামারিতে দিন আনে দিন খায় এমন প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের আয় বন্ধ হয়েছে। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ৩০ ভাগ কম মজুরীতে কাজের অফার করা হচ্ছে। তাদের জন্য বিকল্প কাজের সুযোগ থাকা উচিত। বসত-বাড়ি থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি নানা নির্মাণ কাজের যে সাইটগুলো রয়েছে দেশজুড়ে, সেখানে এখন এরকম নিরিবিলি অবস্থা। অধিকাংশ জায়গায় করোনার কারণে অথবা আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে নির্মাণ সাইটগুলো এভাবে পরে রয়েছে। এ কারণেই যারা দিনমজুর তারা কাজ পাচ্ছেন না। এছাড়া, যে অল্প কিছু কাজ রয়েছে সেখানে তাদের কাজ করতে হচ্ছে কম পারিশ্রমিকে।