করোনা প্রতিরোধ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ

1510

– মহাসীন আলী
অন্যরকম এক সময অতিক্রম করছে এখন পৃথিবী। ধনী, উন্নয়নশীল ও দরিদ্র সব দেশই এ পরিস্থিতির শিকার। ইতিহাসে এর কোনো নজির নেই। গত বছর এ সমযয়ে ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সবস্তরের কর্মীরা নতুন চতুর্থ কৌশলগত পরিকল্পনার ভিশন, মিশন, কৌশল, নতুন ধারণায় কর্মসূচির নতুন কাঠামো বুঝে নেওয়া ও বুঝিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিল। নতুন এ পরিকল্পনায় পরিবর্তনের মূল তত্ত্ব হচ্ছে ‘অধিকার ও প্রাপ্য (জরমযঃং ধহফ ঊহঃরঃষবসবহঃ)’ অর্থাৎ অধিকারের স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। সংস্থার কাজের মূলমন্ত্র ‘উন্নত জীবনের জন্য একসাথে (ঞড়মবঃযবৎ ভড়ৎ ইবঃঃবৎ খরভব)’ অন্যদিকে ‘একটি ন্যায্য ও সমৃদ্ধ সমাজ’ প্রতিষ্ঠা আমাদের ভিশন। কর্মসূচিভিত্তিক তিনটি ডোমেইন যথাক্রমে- ১. স্থায়িত্বশীল জীবিকায়ান; ২. গণতান্ত্রিক সুশাসন এবং ৩. সামাজিক উন্নয়ন ও জলবায়ুু ঘাত-সহিষ্ণুতা-এর অধীনে সকল কার্যক্রম বস্তবায়িত হচ্ছে। পাশাপাশি ইস্যুভিত্তিক পলিসি অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন সংস্থার অন্যতম কার্যক্রম।
চলমান কাজের এ প্রেক্ষাপটে বিগত ডিসেম্বর, ২০১৯-এ সমগ্র পৃথিবীর মতো আমরাও জানলাম, চীনের উহান প্রদেশে করোনাভাইরাস আক্রমণের কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও পৃথিবীর খুব কম দেশই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে। পরবর্তীতে দেখা গেল, পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর সব দেশ ও এলাকা এ আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। একপর্যায়ে চীন এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও ইউরোপ ও আমেরিকায় এখন চলছে মৃত্যুর মিছিল। ইতিমধ্যে এশিয়ায় সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে, আমাদেও দেশে এর ভয়াবহতা আমরা প্রতিদিনই প্রত্যক্ষ করছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সমগ্র আফ্রিকায় বড় সংক্রমণ আসন্ন। আমাদের দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে আগে থেকে আলোচনা হলেও মার্চ মাসের ২য় সপ্তাহ থেকে মূলত সরকারের উদ্যোগে বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কীটের মাধ্যমে রোগী শনাক্তকরণসহ সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হয়। সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি, করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা প্রদান ও সংক্রমণ যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেজন্য অনেক জায়গাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তীতে অসহায় মানুষের জন্য ১০ টাকা কেজি মূল্যে চাল বিক্রি, খাদ্যসহ ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইতিমধ্যে গার্মেন্টস শিল্প, রপ্তানি, কৃষিখাতসহ বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রথম থেকেই মিডিয়া সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য প্রদান করে আসছে, যা অত্যন্ত গুররুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, এনজিও, শিল্পগোষ্ঠী, সমষ্টি ও ব্যক্তি উদ্যোগে দেশব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্নতাসামগ্রীসহ খাদ্যসহায়তা প্রদান অব্যাহত আছে।
আমরা দেখছি প্রতিদিনই করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির ফলে মৃত্যুহার বাড়ছে। বাস্তবে করোনার যথাযথ পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ চাহিদার তুলনায় খুব দুর্বল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অদক্ষ জনবল ও কারো কারো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব, সব মিলিয়ে যথাযথ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বেশকিছু মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীরাও যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা পাচ্ছেন না। সামাজিক অবস্থা এমন হয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে এমনকি মৃত্যু হলেও তারা প্রকৃত কারণ প্রকাশ করছে না। পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন আয়-রোজগার এখন প্রায় বন্ধ। ফলে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা, বিশেষত নানাবিধ অব্যবস্থাপনার কারণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় চিহ্নিত দরিদ্র মানুষসহ ব্যাপক সংখ্যক মানুষের অসহায়ত্ব¡ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলে খাদ্য ও স্বাস্থ্যগত সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মত। এ প্রেক্ষাপটে করোনা প্রতিরোধ এবং একইসাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কাজ শুরু করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমন এক ক্রান্তিকালে, ২৪ এপ্রিল ২০২০, ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ৬ মাসব্যাপী উৎসব পালনের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু উৎসবের সময় এটা নয়। আমরা আশা করি, এ বছরের মধ্যে নিশ্চয়ই উৎসব উদ্যাপনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উপরোউক্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে কল-কারখানা চালুর নির্দেশনা প্রদান করেছেন। ইতিমধ্যে আংশিকভাবে ১৮টি মন্ত্রণালয় খোলার কথা বলা হয়েছে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে করোনা প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ প্রকৃত সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা এবং পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে শিল্প, কৃষিখাতসহ সকল খাতে উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে দরিদ্রসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আয়-উপার্জন অব্যাহত রাখা এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, প্রশাসন, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা বাহিনী, মিডিয়া, রাজনৈতিক দল, প্রাইভেট, এনজিও সেক্টর, কৃষক, শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী সেক্টর এবং সকল সামাজিক ও ব্যক্তি উদ্যোগকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে। যে জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সে জাতি করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবশ্যই জয়ী হবে। এ পরিস্থিতির শুরু থেকেই ওয়েভ ফাউন্ডেশনের কর্মীরা সাধ্যানুযায়ী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণের কাজ করে আসছে। একইসাথে করোনা প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কাজেও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে দেশ ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে নিশ্চয়ই। বাঙালির জীবনে সকল সময়ের প্রেরণা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমরাও বলতে চাই ‘মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’।

প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক
ওয়েভ ফাউন্ডেশন