করোনায় ডিজিটাল রাজনীতি চাঙ্গা, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের শঙ্কা

114

সমীকরণ প্রতিবেদন:
করোনা মহামারীতে স্বাভাবিক রাজনীতির মারাত্মক ছন্দপতন ঘটেছে। প্রতিটি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ প্রায়। নেই মাঠের কর্মসূচি। গত্যন্তর না দেখে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো বেছে নিয়েছে অনলাইন কিংবা ভার্চুয়াল জগৎ। গত মার্চ মাস থেকেই বড় দলগুলো বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থাান তুলে ধরছে অনলাইনের মাধ্যমে। এখন রীতিমতো তা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ারও অপরিহার্য মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। করোনা মহামারী কত দিন স্থাায়ী হবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। তবে এর প্রভাব ও স্থাায়িত্ব যে দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতিতেও কাটছে না চলমান এই মন্দাভাব। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারী করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্বের সীমানা বজায় রাখতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভে এসে বক্তব্য প্রচারে ‘ভার্চুয়াল অ্যাক্টিভিটি’র (অনলাইন প্রচার) ডিজিটাল পন্থা গ্রহণ করেছেন নেতারা। চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে বেড়েছে রাজনৈতিক নেতাদের বিবৃতিও।
রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাস শেষ হওয়ার আপাতত কোনো সুসংবাদ এখনো মেলেনি। সে কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজপথের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচিভিত্তিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কিন্তু যেকোনো উপায়েই হোক দলীয় সক্রিয়তা কিংবা দায়িত্বশীলতা তাদের বজায় রাখতে হবে। এ কারণে ডিজিটাল মাধ্যম বেছে নেয়া হয়েছে। নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে রাজনীতিতেও নানা প্রভাব পড়বে এবং তা হবে দীর্ঘমেয়াদি। রাজনৈতিক দলগুলোর গত দুই মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিরোধী দলগুলোর মতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও ডিজিটাল মাধ্যম বেছে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী করোনা পরিস্থিাতি মোকাবেলায় নানা তৎপরতার কাজ সারছেন ডিজাটাল মাধ্যমে। তারা ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। গত ১২ মে ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিাতি ক্রমেই অবনতিশীল’ বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এর আগের দিন ১১ মে, করোনা সঙ্কটকালে স্বাস্থ্যা খাতের দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। সে দিন এক ভিডিও বার্তায় হানিফ বলেন, জীবন ও জীবিকা, দুটোই আজ বিপন্ন। করোনাভাইরাসের প্রকোপ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাার দুর্বলতাও ততটাই প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকাশ পাচ্ছে আমাদের সামর্থ্যরে ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাব।
গত ২০ মে ওবায়দুল কাদের ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘ঘর থেকে বের হয়ে কেউ আটকা পড়বেন না। সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারকে সহযোগিতা করুন। অন্যথায় সরকারকে আরো কঠোর অবস্থাানে যেতে হবে।’ করোনাকালে দেশে ২১ মে ঘূর্ণিঝড় আমফান আঘাত হানে। আমফান-পরবর্তী অবস্থাা বিশ্লেøষণে সামাজিক দূরত্ব মেনে একটি বৈঠকও করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। ডিজিটাল এই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন নেতারা। ক্ষমতাসীন জোটের শরিক রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনু গত এপ্রিল ও মে মাসে দফায় দফায় সরকারি নানা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে নিয়মিত বিবৃতি দিয়েছেন।
বিএনপির ভার্চুয়াল রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরপরই সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে দলটি। প্রথমে ২৫ মে পর্যন্ত দলীয় কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা ছিল। পরে তা আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে এই সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে ভার্চুয়াল আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএনপির কমিউনিকেশন্স সেল। এক দিকে যেমন অনলাইনে আলোচনা শুরু হয়েছে, অন্য দিকে দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানাতে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। নেতারা ডিজিটাল পন্থায় ত্রাণ ও সুরক্ষাসামগ্রীও বিতরণ করে চলেছেন।
বিএনপির দু’টি জোটের অন্যতম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই ফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে বিএনপি ও নাগরিক ঐক্যের নেতারা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে কয়েকটি অনুষ্ঠান করেছেন। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও দলের আরেক নেতা ডা: জাহেদ উর রহমান টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিচ্ছেন মাঝে মাঝে। গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন বার্ধক্যজনিত কারণে বাসাতেই আছেন। দলের সেক্রেটারি ড. রেজা কিবরিয়া তার নির্বাচনী এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করলেও ভার্চুয়ালি একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। আ স ম আবদুর রব সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন। বিশদলীয় জোটের অনেক শরিক ডিজিটাল মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। করোনাকালে জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতা ভিডিও বার্তায় রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন নিয়মিত। যদিও তারা দলের চিফ প্যাট্রন সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের কার্যক্রম কেবল কয়েকটি বিবৃতি।
সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট করোনাকালে সবচেয়ে বেশি নীরব। ভার্চুয়ালিও এই জোটের নেতাদের পাওয়া গেছে কম। ব্যতিক্রম এই জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া। তাদের নামে নিয়মিত বিবৃতি এসেছে গণমাধ্যমে। কোনো জোটে নেই এমন কয়েকটি দলের নেতারাও চাঙ্গা আছেন ভার্চুয়ালি। প্রতিদিন নিয়ম করে কোনো-না-কোনো টেলিভিশন বা বিভিন্ন সংগঠনের অনলাইনশোতে বক্তব্য দিচ্ছেন তারা। এদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ উল্লেখযোগ্য। বাম দলগুলোর মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলো করোনাকালে সক্রিয় রয়েছে। ত্রাণ বিতরণ, সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ, দরিদ্র মানুষদের আর্থিক সহযোগিতাও করেছে কয়েকটি দল। রাজনৈতিকভাবে সর্বপ্রথম গত ১৩ এপ্রিল করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবেলায় ‘সমন্বিত উদ্যোগ’ এবং ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার দাবি জানায় বাম গণতান্ত্রিক জোট। বামদের এই দাবির প্রতি অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলও সমর্থন জানায়। আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ছাড়া বিএনপি, সিপিবি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বাম জোটসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা স্কাইপের মাধ্যমে এই পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণ করেন। এরপর বামজোট একাধিকবার সামাজিক দূরত্বের নিয়ম মেনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। জোটের শরিক দলগুলো বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পর থেকে ত্রাণ বিতরণ, সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ ও ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনসহ রাজনৈতিক নানা কর্মকাণ্ড করছে গণসংহতি আন্দোলন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে এর সমাপ্তিরেখা যেহেতু এখনো অনিশ্চিত, সে কারণে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই। বিশেষ করে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবে ভিডিও বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমে বড় অংশ সক্রিয় থাকবে। জনসমাবেশ স্বাস্থ্যাকর না হওয়ায় ভার্চুয়ালি নেতারা দলীয় অবস্থান তুলে ধরবেন। সিনিয়র রাজনীতিক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘করোনাভাইরাস কবে যাবে, তা তো বলা যাচ্ছে না। এখন সভা-সমাবেশ করা যাচ্ছে না, বন্ধ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিকল্পনা করেই এগোতে হচ্ছে।’